ফুটবল বিশ্বে শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়। ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নিল স্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার মুকুট জয় করেছে লা রোহা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলেই নির্ধারিত হয় শিরোপার ভাগ্য।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল, আক্রমণের ধার এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই আধিপত্য বিস্তার করে স্পেন। লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, মিকেল ওইয়ারসাবাল ও ফেরান তোরেসের নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ। তবে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে বহু নিশ্চিত গোল রুখে দিয়ে ম্যাচে দলকে টিকিয়ে রাখেন।
পরিসংখ্যানই বলে দেয় ম্যাচে কতটা একপেশে আধিপত্য ছিল স্পেনের। পুরো ম্যাচে তারা ২০টি শট নেয়, যার মধ্যে ১১টি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা মাত্র ৩টি শট নিতে সক্ষম হলেও একটিও ছিল না গোলমুখে। বল দখলেও স্পেন ছিল অনেক এগিয়ে—৬৮ শতাংশ, যেখানে আর্জেন্টিনার দখল ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ। স্প্যানিশরা ৮০৩টি পাস সম্পন্ন করে ৯০ শতাংশ সফলতা নিয়ে, বিপরীতে আর্জেন্টিনা ৪৪৫টি পাস খেললেও সফলতার হার ছিল ৭৮ শতাংশ।
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ পুরো ম্যাচেই ছিল কার্যত অদৃশ্য। লিওনেল মেসিকে ঘিরে স্পেনের মিডফিল্ড ও ডিফেন্স এমনভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যে তিনি পুরো ম্যাচেই প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবার কোনো দল একটিও শট অন টার্গেটে নিতে ব্যর্থ হলো—এই অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের সাক্ষী হলো আর্জেন্টিনা।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা স্পেনের পেনাল্টি বক্সে কার্যকর কোনো আক্রমণই গড়ে তুলতে পারেনি। স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমনের পুরো ম্যাচে কোনো সেভ করতে হয়নি, কারণ তাঁর দিকে উল্লেখযোগ্য কোনো শটই আসেনি। বিপরীতে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে ব্যস্ত খেলোয়াড়। একের পর এক সেভ করে তিনি ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত নিয়ে যান।
ম্যাচের যোগ করা সময়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনার জন্য। এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আলবিসেলেস্তেরা। সংখ্যাগত সুবিধা পাওয়ার পর স্পেন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত সেই চাপই এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত গোল।
অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে পেদ্রো পোরোর দারুণ ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামসের হেড ফেরান তোরেসের সামনে পৌঁছে যায়। স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড কোনো ভুল না করে বল জড়িয়ে দেন জালে। সেই এক গোলই স্পেনকে এনে দেয় ১৬ বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ ট্রফি।
স্পেন আরও বড় ব্যবধানে জিততে পারত। ম্যাচে নিকো উইলিয়ামসের একটি গোল ফাউলের কারণে বাতিল হয় এবং ফেরান তোরেসের আরেকটি গোল অফসাইডের জন্য গণ্য হয়নি। তবুও পুরো ম্যাচে স্পেনের দাপট নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
টুর্নামেন্টজুড়েই দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল হজম করে শিরোপা জয়ের বিরল কীর্তিও গড়েছে তারা। আক্রমণ, রক্ষণ ও মাঝমাঠ—তিন বিভাগেই অসাধারণ ভারসাম্য রেখে প্রতিপক্ষদের একের পর এক হারিয়ে বিশ্বসেরার আসনে বসেছে স্পেন।
অন্যদিকে এই পরাজয়ের মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ হলো লিওনেল মেসির আরেকটি স্বপ্ন। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখালেও ফাইনালে নিজের ছাপ রাখতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ফলে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল তাঁর।
ম্যাচ শেষে নিকো উইলিয়ামস নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার তাঁর আদর্শ ছিলেন এবং এই বিশ্বকাপ জয় তিনি নেইমারকে উৎসর্গ করতে চান। নিকোর ভাষায়, "আমি আশা করি নেইমার আমাদের খেলা দেখেছেন। এই শিরোপা তাঁর জন্যও।"
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠে স্পেন শিবির। ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে লা রোহা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের চোখে ছিল হতাশা, আর লিওনেল মেসির জন্য এটি হয়ে রইল বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি হৃদয়ভাঙা সমাপ্তি।











