হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে এমন একটি ম্যাচের সাক্ষী থাকল ক্রিকেট বিশ্ব, যেখানে একই দিনে ইতিহাস, হতাশা, গর্ব আর লজ্জা—সবকিছুই একসঙ্গে লিখল বাংলাদেশ। একদিকে তরুণ পেসার নাহিদ রানা গড়লেন বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের নতুন ইতিহাস। ১০ ওভারে মাত্র ২১ রান দিয়ে ৬ উইকেট শিকার করে ভেঙে দিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজার দুই দশকের পুরোনো রেকর্ড। অন্যদিকে মাত্র ১৪২ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ব্যাটিংয়ে এমন আত্মসমর্পণ করল বাংলাদেশ, যা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্সগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে। শেষ পর্যন্ত ১১৬ রানে অলআউট হয়ে ২৫ রানের পরাজয় দিয়ে সিরিজ শুরু করেছে টাইগাররা।
ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটিং। কারণ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে ১৪২ রান তাড়া করা সাধারণত খুব কঠিন লক্ষ্য নয়। আধুনিক ক্রিকেটে এমন লক্ষ্য অধিকাংশ দলই স্বাচ্ছন্দ্যে অতিক্রম করে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটাররা শুরু থেকেই এমনভাবে উইকেট বিলিয়ে দিয়েছেন, যেন ম্যাচটি জেতার নয়, বরং হারার প্রতিযোগিতা চলছে। সাতজন ব্যাটার দুই অঙ্কের ঘরেই পৌঁছাতে পারেননি। এমন ব্যাটিংয়ের পর নাহিদ রানার রেকর্ডও যেন ম্লান হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের ভাগ্য হয়তো ভালো যে এই ম্যাচের সময় পুরো ক্রিকেটবিশ্বের নজর ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের দিকে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইউরোপিয়ান জায়ান্টদের ম্যাচ নিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম, তখন বাংলাদেশের এই ভয়াবহ ব্যাটিং ব্যর্থতা তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় এসেছে। অথচ মাত্র কয়েকদিন আগেই একই সফরে আড়াই দিনের মধ্যে টেস্ট হেরে সমালোচনার মুখে পড়েছিল টাইগাররা। সেই হতাশা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ ছিল প্রথম ওয়ানডেতে। কিন্তু উল্টো আরও একটি লজ্জার অধ্যায় যোগ হলো বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য সবকিছু বাংলাদেশের পক্ষেই যাচ্ছিল। টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে আত্মবিশ্বাসী শুরু করেছিল জিম্বাবুয়ে। উদ্বোধনী জুটিতে ৩৬ রান যোগ করেন বেন কারান ও ব্রায়ান বেনেট। তখন মনে হচ্ছিল স্বাগতিকরা বড় সংগ্রহের দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু ইনিংসের সপ্তম ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজের অসাধারণ থ্রোতে রানআউট হন বেন কারান। এই একটি মুহূর্তই যেন পুরো ম্যাচের গতি বদলে দেয়।
কারানের বিদায়ের পর তাসকিন আহমেদ নিজের অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন। একই ওভারের শেষ বলে ফেরান ব্রায়ান বেনেটকে। এরপর নিজের পরের ওভারেই দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বোল্ড করেন জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক ক্রেইগ আরভিনকে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপের মুখে পড়ে যায় স্বাগতিকরা।
এরপর শুরু হয় নাহিদ রানার শো। বাংলাদেশের তরুণ গতিতারকা নিজের গতি, বাউন্স এবং নিখুঁত লাইন-লেন্থ দিয়ে একের পর এক ব্যাটারকে সাজঘরে ফেরাতে থাকেন। রাজা, মাধেভেরে, ইভান্স—কেউই তাঁর সামনে টিকতে পারেননি। নতুন বলে যেমন ভয়ংকর ছিলেন, পুরোনো বলেও ঠিক ততটাই কার্যকর ছিলেন তিনি। শর্ট বল, ইয়র্কার এবং অফ-স্টাম্পে ধারাবাহিক আক্রমণে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং লাইনআপকে কার্যত ধ্বংস করে দেন।
নিজের ষষ্ঠ ওভারে এসে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় পাঁচ উইকেট। এরপর এনগারাভাকে ফিরিয়ে পূর্ণ করেন ছয় উইকেট। শেষ পর্যন্ত ১০ ওভারে মাত্র ২১ রান দিয়ে ৬ উইকেট শিকার করে গড়েন নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে কোনো বোলারের এটিই এখন সেরা বোলিং।
২০০৬ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে মাশরাফি বিন মুর্তজার ২৬ রানে ৬ উইকেট ছিল দীর্ঘদিনের রেকর্ড। প্রায় ২০ বছর পর সেই রেকর্ড নিজের নামে লিখে নিলেন নাহিদ রানা। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে এখন ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার তালিকায় মোস্তাফিজুর রহমানের পরই তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী হলো।
তবে নাহিদের আগুনঝরা বোলিংয়ের পরও পুরো কৃতিত্ব বাংলাদেশ ধরে রাখতে পারেনি। কারণ জিম্বাবুয়ের শেষ জুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রিচার্ড এনগারাভা ও নিয়ামুরি নবম উইকেটে ৬৩ রান যোগ করে দলকে একশোর অনেক ওপরে নিয়ে যান। এনগারাভা করেন ২৭ রান, নিয়ামুরি ৩৩। শেষ পর্যন্ত ১৪১ রানে অলআউট হয় জিম্বাবুয়ে।
১৪২ রানের লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে স্বস্তি থাকারই কথা ছিল। কারণ এমন লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুবই ছোট। কিন্তু মাঠে নেমে সেই আত্মবিশ্বাসের কোনো ছাপ দেখা যায়নি।
সৌম্য সরকার, তানজিদ হাসান এবং নাজমুল হোসেন শান্ত—টপ অর্ডারের তিন ব্যাটার মাত্র ১৭ রানের মধ্যেই ফিরে যান। স্কোরবোর্ডে রান বাড়ার আগেই বাংলাদেশের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ চাপ।
এরপর তাওহিদ হৃদয় ও নুরুল হাসান সোহান ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন। দুজন ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাটিং করেন। চতুর্থ উইকেটে ৪৯ রানের জুটি গড়ে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেন। যদিও তাঁদের রান তোলার গতি ছিল ধীর, তবু উইকেট হাতে রেখে ম্যাচ শেষ করার দিকেই এগোচ্ছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু হৃদয় ২৫ রান করে আউট হতেই আবার শুরু হয় ধস। মোসাদ্দেক হোসেন মাত্র ৩ রান করে ফিরে যান। অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও পারেননি দায়িত্ব নিতে। মাত্র ১০ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনিও।
এক প্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন নুরুল হাসান সোহান। কিন্তু তিনিও ৩১ রান করে এলবিডব্লিউ হলে বাংলাদেশের শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়।
এরপর রিশাদ, তাসকিন, মোস্তাফিজ কিংবা নাহিদ—কেউই আর ম্যাচ বাঁচানোর মতো কিছু করতে পারেননি। ৩৩.১ ওভারে মাত্র ১১৬ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ।
জিম্বাবুয়ের হয়ে রিচার্ড এনগারাভা ও ব্র্যাড ইভান্স তিনটি করে উইকেট নেন। মুজারাবানি ও নিয়ামুরি দুটি করে উইকেট শিকার করেন।
এই ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেল। টেস্টে ব্যর্থতার পর ওয়ানডেতেও একই চিত্র কেন? কেন ছোট লক্ষ্য তাড়া করতেও আত্মবিশ্বাসহীন ব্যাটিং? কেন আন্তর্জাতিক মানের বোলিং পারফরম্যান্সকে ব্যাটাররা মূল্য দিতে পারছেন না?
নাহিদ রানার মতো একজন পেসার যখন ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স করেন, তখন দলের উচিত ছিল তাঁকে একটি স্মরণীয় জয় উপহার দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রেকর্ড গড়া দিনেই তিনি পরাজিত দলের সদস্য হয়ে মাঠ ছাড়লেন। শেষ উইকেট পড়ার সময় নন-স্ট্রাইকে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনিই—যেন পুরো ম্যাচের প্রতীকী ছবি।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এটি নতুন নয়। অতীতেও বহুবার দেখা গেছে, একজন বোলারের অসাধারণ পারফরম্যান্স ব্যাটিং ব্যর্থতায় হারিয়ে গেছে। হারারের এই ম্যাচ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন মাত্র।
এখন সিরিজে টিকে থাকতে হলে ৯ জুলাই দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। শুধু জয় নয়, প্রয়োজন ব্যাটিং ইউনিটের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া। কারণ নাহিদ রানারা যদি নিয়মিত এমন বোলিং করেন, আর ব্যাটাররা যদি ১৪২ রানও তাড়া করতে না পারেন, তাহলে বাংলাদেশের জন্য সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
হারারের প্রথম ওয়ানডে তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি হার নয়; এটি আত্মসমালোচনারও একটি বড় উপলক্ষ। একদিকে ইতিহাস গড়া বোলিং, অন্যদিকে ইতিহাসের অন্যতম হতাশাজনক ব্যাটিং—এই দুই বিপরীত চিত্রই ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখবে বহুদিন।











