মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ড্যালাস স্টেডিয়ামের মাঠ ঘিরে ছিল উত্তেজনার চরম সীমা। আইবেরিয়ান উপদ্বীপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে চলেছিল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ‘রাউন্ড অব ১৬’-এর এই হাইভোল্টেজ ডার্বি। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের সমর্থকরা স্টেডিয়ামের প্রতিটি গ্যালারি ভরিয়ে তোলে, স্পেনের লাল জার্সি আর পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সিতে মাঠ রাঙিয়ে দেয় তারা। তবে কারও কারও চোখে ছিল বিশেষ এক চমক—বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো হয়তো দেখা যাবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। পর্তুগিজ ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে সমর্থকদের কণ্ঠে কণ্ঠে এক প্রশ্ন—এটাই কি সিআরসেভেনের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ? উত্তর পেতে বেশি সময় লাগেনি। ম্যাচের ৯১তম মিনিটে যখন মিকেল মেরিনোর আত্মঘাতী সদৃশ নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ায়, তখন বুঝে যান সবাই—এই গোল শুধু একটি ম্যাচের পরিণতি নির্ধারণ করে না, বরং এটি পর্তুগাল ফুটবলের একটি স্বর্ণালী অধ্যায়ের পর্দা নামিয়ে দেয়। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই ড্যালাসের আকাশে বিষাদের মেঘ জমে ওঠে। ১-০ গোলের এই হারের সাথেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় পর্তুগাল, আর বিদায় নেয় তাদের কিংবদন্তি অধিনায়কের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ আশা।
মিকেল মেরিনোর সেই গোলটি আসলে একটি সহজ গোল ছিল না। ফেরান তোরেসের বাঁ পাশ থেকে আসা ক্রসে মেরিনো বল নিয়ন্ত্রণে এনে পর্তুগিজ ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে জোরালো শট নেন, যা গোলরক্ষক দিয়োগো কোস্তাকে ছুঁয়ে জালে জড়ায়। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে এই গোলটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর আগে পুরো ৯০ মিনিটে দুই দলই সমানে সমানে লড়েছে, গোলের সুযোগ তৈরি করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই স্কোরবোর্ডে সংখ্যা যোগ করতে পারেনি। পর্তুগিজ কোচ রবার্তো মার্তিনেজের পরিকল্পনা ছিল স্প্যানিশ মিডফিল্ডকে চেপে ধরা এবং কাউন্টার-অ্যাটাকের মাধ্যমে গোল করার। কিন্তু স্পেনের পাসিং গেম এবং উচ্চ প্রেসিং পর্তুগালের সেই পরিকল্পনা বারবার ভণ্ডুল করে দেয়। প্রথমার্ধে রোনালদো বল স্পর্শ করেছিলেন মাত্র ১২ বার, যা মাঠে থাকা অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে কম। এমনকি স্পেনের সেন্টার ফরোয়ার্ড মিকেল ওইয়ারসাবালও তাঁর চেয়ে ৯ বার বেশি বল পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ছন্দে ফিরলেও, রোনালদোকে স্প্যানিশ ডিফেন্সের কড়া পাহারা থেকে মুক্ত হতে দেয়নি তারা। মার্টিনেজ চেষ্টা করেছিলেন ডি-বক্সে ক্রস বাড়ানোর, কিন্তু স্প্যানিশ ডিফেন্স দারুণ সংগঠিত ছিল। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিটে সেই গোল, যা পর্তুগালের সব স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়।
ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলের কোচের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন স্প্যানিশ মাস্টারমাইন্ড রবার্তো মার্তিনেজ। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত আবেগঘন ও দৃঢ় কণ্ঠে ৫২ বছর বয়সী এই কোচ সাফ জানিয়ে দেন, পর্তুগাল ড্রেসিংরুমে এখন একজন নতুন নেতা এবং নতুন কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন। মার্তিনেজ বলেন, আমি পর্তুগালে বিশ্বকাপ জিততে এসেছিলাম। যেহেতু আমরা সেটা জিততে পারিনি, তাই এখানে আমার আর চালিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। এখানেই আমার শেষ। তিনি আরও জানান, এই ম্যাচ শেষ হওয়ার সাথেই মূলত তার চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। তবে নিজের মেয়াদের মূল্যায়ণ করতে গিয়ে কিছুটা ক্ষোভের সুরেই তিনি যোগ করেন, প্রথমত, আমরা ব্যর্থ হইনি। আমরা টুর্নামেন্টের অন্যতম হট-ফেভারিটের কাছে হেরেছি। আমরা মাঠে সমানে-সমানে লড়েছি, নিজেদের সেরাটা দিয়েছি। তবে বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় এই চক্রের এখানেই ইতি টানা উচিত। মার্তিনেজের এই বিদায় পর্তুগিজ ফুটবল মহলে বেশ আলোড়ন ফেলে। উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর ২০২৪-২৫ মরশুমে এই স্পেনকেই টাইব্রেকারে হারিয়ে পর্তুগালকে উয়েফা নেশনস লিগের ট্রফি এনে দেওয়াটাই ছিল মার্তিনেজ জমানার সবচেয়ে বড় সাফল্য। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ২৩৩ ম্যাচের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনেও তার বড় ভূমিকা ছিল। তিনি রোনালদোর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন, তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখেন এবং দলের প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁর ব্যবহার নিয়ে বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তগুলোই দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রত্যাশিত সাফল্য না আসায় তার পদত্যাগ যেন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য এই রাত ছিল আরও বেশি বেদনাদায়ক। ৪১ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি ফুটবলার টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছিলেন এই টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুটি গোল এবং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে একটি গোল—এই তিনটি গোল তার বিশ্বকাপ অভিযানের সেরা মুহূর্ত। কিন্তু নকআউট পর্বে স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তিনি ছিলেন পুরোপুরি নিষ্প্রভ। ম্যাচের ৯০ মিনিট তিনি মাঠে ছিলেন, কিন্তু কোনো শট লক্ষ্যে নিতে পারেননি, কোনো ড্রিবলে ডিফেন্সকে ভাঙতে পারেননি। তাঁর গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ফিনিশিং—যা এক সময় বিশ্বসেরা ছিল—তা যেন সময়ের অভাবে ম্লান হয়ে গেছে। ম্যাচ শেষে যখন রেফারি শেষ বাঁশি বাজান, রোনালদো একা মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর চোখে ছিল জল, আর মনে ছিল হাজারো অসমাপ্ত স্বপ্ন। স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের উল্লাসের মাঝে তিনি নীরবে হাঁটতে থাকেন টানেলের দিকে। স্টেডিয়ামের বিশাল স্ক্রিনে যখন তাঁর মুখ ফুটে ওঠে, তখন গ্যালারির পর্তুগিজ সমর্থকরা দাঁড়িয়ে করতালি দিতে থাকেন—সম্মান জানিয়ে বিদায় দিতে চান তাঁকে। তিনি হাত নাড়িয়ে সাড়া দেন, কিন্তু সেই হাসি ছিল বেদনার।
এই ম্যাচটিই যে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হতে পারে, তা ম্যাচ শুরুর আগেই অনেকে অনুমান করেছিলেন। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পর তা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। তিনি ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমকে কোনো কথা বলেননি, তবে তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজই সব বলে দিয়েছে। পর্তুগিজ ফেডারেশন সূত্রে জানা গেছে, রোনালদো অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। তাঁর ম্যানেজার জর্জ মেন্ডেসও জানিয়েছেন, রোনালদো চান জাতীয় দলকে নতুন রূপান্তরের পথে ছেড়ে দিতে। তাঁর বয়স আর পারফরম্যান্স—উভয়ই তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর রেকর্ড কথা বলবে চিরকাল। পর্তুগালের হয়ে ২৩৩ ম্যাচে ১৪৬ গোল এবং ৪৬ অ্যাসিস্ট—যা কোনো দিন ভাঙা কঠিন। তিনি পর্তুগালকে এনে দিয়েছেন ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৯ ও ২০১৫ সালের দুটি নেশনস লিগের ট্রফি। তবে বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁর অধরা থেকে যায়। তিনি ফিফা বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় আছেন, কিন্তু সোনার ট্রফিটি ছুঁতে পারেননি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যান্য মহানদের মতো তিনিও এই একটা ট্রফির জন্য হাহাকার করে যাবেন।
মার্তিনেজের বিদায়ের পর পর্তুগিজ ফুটবল মহলে ইতোমধ্যেই নতুন কোচের গুঞ্জন শুরু হয়েছে। সবচেয়ে জোরালো নামটি হচ্ছে হোর্হে জেসুস—যিনি বর্তমানে সৌদি ক্লাব আল-নাসরের কোচ এবং রোনালদোকে সেখানে লিগ জেতানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। জেসুসের সঙ্গে রোনালদোর ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভালো, এবং তিনি তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নয়নে দক্ষ। তবে আরও কয়েকজন সম্ভাব্য কোচের নাম উঠে এসেছে—যেমন পুর্তুগিজ নিজেই লুইস কাস্ত্রো, যিনি বর্তমানে বোতাফোগোর কোচ এবং পূর্বে আল-হিলালের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া পূর্বতন পর্তুগিজ কোচ ফার্নান্দো সান্তোসও আবার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন, যদিও তিনি ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর পদত্যাগ করেছিলেন। তবে ফেডারেশন সূত্র জানিয়েছে, তারা চান একজন আধুনিক, কৌশলবিশেষজ্ঞ কোচ, যিনি দলটিকে পুনর্নির্মাণ করতে পারেন। পর্তুগালের বর্তমান স্কোয়াডে রয়েছে অনেক তরুণ প্রতিভা—ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, জোয়াও ফেলিক্স, রাফায়েল লিয়াও, গনসালো ইনাসিও, আন্তোনিও সিলভা—যারা আগামী বছরগুলোতে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। নতুন কোচকে এই তরুণদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ইউনিট গড়তে হবে।
এই ব্যর্থতার পেছনে কৌশলগত কারণগুলোও বিশ্লেষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা। মার্তিনেজের সময়ে পর্তুগালের খেলার ধরন ছিল আক্রমণমুখী, কিন্তু প্রতিরক্ষা ছিল দুর্বল। স্পেনের বিপক্ষে গোলটি এসেছে প্রতিরক্ষার গলদ থেকেই—মিডফিল্ডে বল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেরান তোরেসকে অনেকটা জায়গা দিয়ে দেওয়া। এছাড়া মার্তিনেজ রোনালদোকে নিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেমন তাঁকে প্রতিটি ম্যাচে শুরু করানো, যদিও তাঁর ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এই সিদ্ধান্ত দলের সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট করেছে বলে অনেকে মনে করেন। পর্তুগালের স্কোয়াডে রোনালদো ছাড়াও গোল করার মতো অনেক প্রতিভা রয়েছে, কিন্তু মার্তিনেজ তাদের ঠিক মতো ব্যবহার করতে পারেননি। জোয়াও ফেলিক্স ও রাফায়েল লিয়াওকে প্রায়ই বদলি রাখা হয়েছে, যা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। নতুন কোচকে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে দল গঠন করতে হবে।
রোনালদো যে অবসর নিতে চলেছেন, তা প্রায় নিশ্চিত। তিনি চান না দল তাঁর উপর নির্ভরশীল থাকুক। তিনি ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি আবেগঘন পোস্ট করেছেন, যাতে তিনি পর্তুগিজ জনগণ, সতীর্থ এবং কোচদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আমি সবকিছু দিয়েছি, সবসময় দেব। কিন্তু সময় এসেছে নতুন দিগন্তের।” তাঁর এই পোস্টের পর ফুটবল বিশ্ব তাঁকে বিদায় জানাতে শুরু করেছে। রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ইউভেন্টাস, আল-নাসর—প্রাক্তন সব ক্লাব এবং অসংখ্য সতীর্থ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। লিওনেল মেসি, যিনি তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, তিনিও একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তাঁকে ‘ফুটবলের সেরা আইকন’ বলে অভিহিত করেছেন। ফিফা কর্তৃপক্ষও একটি বিশেষ ভিডিও প্রকাশ করে তাঁকে সম্মান জানিয়েছে, যা বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে সম্প্রচারিত হবে।
ড্যালাসের এই রাত ফুটবল ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে—যেখানে শেষ হয়েছে এক যুগের সমাপ্তি। পর্তুগালের স্বপ্ন শেষ, রোনালদোর স্বপ্ন শেষ, মার্তিনেজের যাত্রা শেষ। কিন্তু ফুটবল থেমে থাকে না। নতুন প্রতিভারা উঠে আসছে, নতুন গল্প তৈরি হচ্ছে। পর্তুগালের জন্য সামনে ইউরো ২০২৮ এবং ২০৩০ বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট রয়েছে। তাদের উচিত এখন থেকেই পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তোলা। রোনালদোকে ছাড়া পর্তুগাল কীভাবে খেলবে, সেটা দেখার বিষয়। হয়তো প্রথম দিকে কিছুটা ভোগান্তি হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা দলের জন্য ভালো হতে পারে। কারণ, অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কোনো দলকে এগিয়ে নেয় না। নতুন কোচ আক্রমণভাগে ফেলিক্স, লিয়াও, আর ছোটদের নিয়ে একটি আক্রমণাত্মক ইউনিট গঠন করতে পারেন। মিডফিল্ডে ব্রুনো ফার্নান্দেস ও বের্নার্দো সিলভার অভিজ্ঞতা আছে। ডিফেন্সে ইনাসিও ও সিলভা ভবিষ্যতের ভিত্তি হতে পারেন। নতুন দল গঠনে সময় লাগবে, কিন্তু সম্ভাবনা আছে।
স্প্যানিশ ক্যাম্পে অবশ্য উৎসবের মেজাজ। তারা সেমিফাইনালে উঠেছে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স বা ইংল্যান্ড হতে পারে। স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তাঁর দলের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, ‘পর্তুগাল একটি দুর্দান্ত দল, আমরা ভাগ্যবান যে শেষ মুহূর্তে গোল পেয়েছি।’ স্পেনের তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে পেদ্রি, গাভি, লামিনে ইয়ামাল ইত্যাদি উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন। তারা এই বিশ্বকাপ জিততে মরিয়া, যা ২০১০ সালের পর আর আসেনি। অন্যদিকে পর্তুগালের বিদায় স্প্যানিশ সমর্থকদের জন্য আনন্দের হলেও, অনেকেই রোনালদোকে সম্মান জানাতে ভোলেননি। স্টেডিয়ামে স্প্যানিশ অনেক সমর্থকও তাঁর নাম ধরে চিয়ার করেছেন।
আর্থিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে রোনালদোর বিদায় পর্তুগিজ ফুটবলকে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা জার্সি বিক্রি, টিভি স্বত্ব, স্পন্সরশিপ—সবকিছুতেই প্রভাব ফেলত। কিন্তু দলকে এখন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। পর্তুগিজ ফেডারেশন নতুন কোচ নিয়োগ এবং তরুণ প্রতিভাদের প্রমোশনের ওপর গুরুত্ব দিতে চলেছে। বিশেষ করে ঘরোয়া লিগ থেকে নতুন খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে ডাকা হবে। বেনফিকা, স্পোর্টিং, পোর্তো—এই তিন ক্লাবের একাডেমি থেকে উঠে আসা প্রতিভারা এখন জাতীয় দলের মেরুদণ্ড। নতুন কোচ যদি তাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে পর্তুগাল আবারও বড় দল হয়ে উঠতে পারে।
মঙ্গলবারের এই হার শুধু একটি ম্যাচের হার নয়, এটি একটি যুগের অবসান। রোনালদো, যিনি ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন সময়েও পর্তুগালকে মাথা উঁচু করে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি এখন মাঠ ছেড়ে যাচ্ছেন। তাঁর শেষ মুহূর্তগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকবে—ড্যালাসের পিচে একা দাঁড়িয়ে থাকা, অশ্রুভেজা চোখ, প্রতিপক্ষের উল্লাসের মাঝে হারিয়ে যাওয়া সেই অবয়ব। কোচ মার্তিনেজ তাঁর বিদায় বক্তব্যে বলেছেন, “ক্রিস্টিয়ানো ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠদের একজন। তিনি যা করেছেন, তা কখনো ভোলার নয়।” তবে খেলার বাস্তবতা কঠিন, সময় কাউকে ছাড় দেয় না। রোনালদোর মতো অমর কিংবদন্তি হয়েও শেষ পর্যন্ত তাকে সময়ের কাছে মাথা নত করতে হলো।
এই ঘটনা ফুটবল বিশ্বে নতুন আলোচনা শুরু করেছে—খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায় কীভাবে পরিচালনা করা উচিত, কখন অবসর নেওয়া উচিত, কীভাবে কিংবদন্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা আর দলের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। মার্তিনেজ বার বার রোনালদোকে খেলিয়েছেন, হয়তো আবেগের বশে, হয়তো ফেডারেশনের চাপে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা দলের ফলকে প্রভাব ফেলেছে। নতুন কোচের জন্য এটি একটি শিক্ষা।
সামনের দিনগুলোতে পর্তুগাল জাতীয় দল অনেক পরিবর্তন দেখতে পাবে। ড্রেসিংরুমে নতুন নেতৃত্ব আসবে, হয়তো ব্রুনো ফার্নান্দেস অধিনায়ক হবেন। দলের খেলার ধরনও বদলাবে—আক্রমণ থেকে শুরু করে ডিফেন্স, সবকিছু পুনর্বিন্যাস করতে হবে। ফেডারেশন জানিয়েছে, তারা আগামী দুই মাসের মধ্যে নতুন কোচ নিয়োগ করবে এবং সেপ্টেম্বরে নেশনস লিগের ম্যাচের মাধ্যমে নতুন দলকে প্রস্তুত করবে। সমর্থকরা আশাবাদী যে, রোনালদোর বিদায় পর্তুগালকে পুরোপুরি নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেবে।
ড্যালাস স্টেডিয়ামের সেই রাতের স্মৃতি ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন থাকবে। আর বোধ হয়, সেখানেই শেষ হলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায়। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম উজ্জ্বল থাকবে, তাঁর রেকর্ড থাকবে, তাঁর অবদান থাকবে। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফির জন্য সেই চিরকালের হাহাকার থেকেই যাবে। এটি ফুটবলের একটি ট্র্যাজিক মহাকাব্য—যেখানে একজন মহান নায়ক তাঁর শেষ লড়াইয়ে হেরে যান, কিন্তু পুরো পৃথিবী তাঁকে সম্মান জানায়। পর্তুগালের জন্য নতুন সূর্য উঠবে হয়তো, কিন্তু আজকের এই অস্তমিত সূর্যের আলো চিরকাল জ্বলবে ফুটবলের ইতিহাসে।