বিশ্বের বিভিন্ন শহরের জীবনমান, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধার ভিত্তিতে প্রকাশিত ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU)–এর ২০২৬ সালের গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্সে আবারও বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। ১৭৩টি শহরের মধ্যে ১৭১তম অবস্থানে থেকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা। গত বছরের মতো এবারও একই অবস্থানে রয়েছে রাজধানী।
EIU-এর এই বার্ষিক সূচক মূলত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ (HR) বিভাগ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিদেশে কর্মরত পেশাজীবীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়। বিভিন্ন শহরে কর্মরত প্রবাসী কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রার মান, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে এই সূচক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এবারের মূল্যায়নে বিশ্বের ১৭৩টি শহরকে স্থিতিশীলতা (Stability), স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare), শিক্ষা (Education), সংস্কৃতি ও পরিবেশ (Culture & Environment) এবং অবকাঠামো (Infrastructure)—এই পাঁচটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এসব সূচকের সম্মিলিত মূল্যায়নে ঢাকার মোট স্কোর দাঁড়িয়েছে ৪১.৭, যা তালিকার নিচের দিকের শহরগুলোর অন্যতম।
প্রকাশিত তালিকায় ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি (১৭২তম) এবং সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক (১৭৩তম)। ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরের অবস্থান ধরে রেখেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক। চলতি বছর শহরটির মোট স্কোর ৩১.৬।
অন্যদিকে তালিকার শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের স্বীকৃতি ধরে রেখেছে শহরটি। কোপেনহেগেনের মোট স্কোর ৯৮, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ। স্থিতিশীলতা, শিক্ষা এবং অবকাঠামো খাতে প্রায় পূর্ণ নম্বর অর্জন করেছে শহরটি।
শীর্ষ পাঁচে আরও রয়েছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, জাপানের টোকিও এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনি। উত্তর আমেরিকার একমাত্র শহর হিসেবে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শীর্ষ দশে স্থান পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চমানের শিক্ষা, নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং কার্যকর অবকাঠামোই এসব শহরকে বিশ্বসেরাদের কাতারে রেখেছে।
ঢাকার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা, তীব্র যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, জনসংখ্যার চাপ এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা রাজধানীর বাসযোগ্যতার মানকে দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া এবং নগর সেবার ঘাটতি রাজধানীর অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে এশিয়ার সামগ্রিক অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি বিনিয়োগের কারণে চীনের শহরগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। দেশটি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের বাসস্থান থেকে ১৫ মিনিট হাঁটার দূরত্বের মধ্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যাবে।
তবে চীনের শহরগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা তাদের আরও ভালো অবস্থানে যেতে বাধা সৃষ্টি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরের অবস্থানও চলতি বছরে অবনতি হয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও নিরাপত্তা সংকটের প্রভাবে ওমানের মাস্কাট ১৪ ধাপ পিছিয়ে গেছে। একই সঙ্গে দোহা, দুবাই এবং আবুধাবির অবস্থানও আগের তুলনায় কয়েক ধাপ নিচে নেমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাসযোগ্যতার এই সূচক শুধু একটি র্যাংকিং নয়; এটি একটি শহরের জীবনমান, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং নাগরিক সেবার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে। তাই রাজধানী ঢাকার অবস্থানের উন্নতি করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, আধুনিক গণপরিবহন, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার চাপ মোকাবিলা, পরিকল্পিত আবাসন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ উন্মুক্ত স্থান বৃদ্ধি ছাড়া ঢাকার বাসযোগ্যতা সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি অর্জন করা কঠিন হবে।











