রাজধানীর পল্লবীর সরু গলিগুলো। দিনের বেলায় যেখানে শিশুদের হাসি-ঠাট্টা, সন্ধ্যায় পাড়ার আড্ডা, আর রাত নামলেই নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কিন্তু শুক্রবার দিবাগত সেই রাতটা পল্লবীর ইতিহাসে লেখা থাকবে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে। নিস্তব্ধতা ভেঙেছিল এক কিশোরীর আর্তনাদে—না, আর্তনাদটি হয়তো ছিলই না; কারণ তার মুখে চেপে ছিল বালিশ, আর তার শরীর জুড়ে ছিল পাশবিক নির্যাতনের চিহ্ন।
ঘটনাটি যেন একটি ভয়াবহ চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো, কিন্তু এটা বাস্তব। বাস্তবতার চেয়েও কঠিন, আরও নিষ্ঠুর। ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী, যে হয়তো এখনও ভাবছে তার স্কুলের পড়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, অথবা আগামীকালের স্বপ্ন; সেই শিশুটিকে তার নিজের বাড়ির পাশের এক ‘প্রতিবেশী’ তার বলির ঘরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। শুধু নিয়ে যায়নি, তাকে নির্মমভাবে মারধর, বালিশ দিয়ে শ্বাসরোধ, এবং অচেতন অবস্থায় ধর্ষণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন (৫০) নামের ওই ব্যক্তি শুধু একজন প্রতিবেশী নন, তিনি ছিলেন আস্থার ভানকারী এক দানব।
শুক্রবার গভীর রাত। প্রায় রাত ২টা ৪০ মিনিট। ঘুমন্ত পাড়া। হঠাৎ ঘুম ভেঙে শৌচাগারের প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হয় কিশোরীটি। অন্ধকার। কিছুই চোখে পড়ছে না তার। কিন্তু অন্ধকারে তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক ভয়ঙ্কর প্রতীক্ষা।
প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন আগে থেকেই ওঁত পেতে ছিল। তাকে দেখে মুখ চেপে ধরে সে। কিশোরীটি চিৎকার করার আগেই তার মুখের ওপর চেপে ধরা হয় হাত। তারপর মৃতপ্রায় নিঃশব্দে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় আনোয়ারের ঘরের দিকে। এরপর যা ঘটে তা শুনলে রক্ত শিউরে ওঠে।
স্বজনদের কাছ থেকে জানা যায়, আনোয়ার হোসেন কেবল শারীরিক নির্যাতনই করেনি; সে কিশোরীকে মারধর করেছে, তার মুখে বালিশ চেপে ধরে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলেছে। যখন শিশুটি অজ্ঞান হয়ে গেল, তখনই সে তার ওপর দিয়ে তার পাশবিক লালসা চরিতার্থ করে। ধর্ষণ শেষে তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায় পাষণ্ড আনোয়ার।
রাতের শেষ প্রহর। কিশোরীটি তখনও অচেতন, শীতল মাটিতে পড়ে রয়েছে। তার আশেপাশে রক্তের ফোঁটা। ঠিক তখনই স্থানীয় একজন ব্যক্তি ফজরের অজু করতে বের হন। তিনি কয়েক ধাপ যেতেই হিমশীতল হয়ে যান। অন্ধকারে কী যেন দেখতে পান তিনি—একটি অসাড় শরীর।
আতঙ্কিত হয়ে তিনি চিৎকার দেন। তাঁর চিৎকারে ঘুম ভাঙে পাড়ার। একে একে জড়ো হন স্থানীয়রা এবং ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার। তাদের চোখের সামনে ছিল নৃশংসতার এক মূর্ত প্রতীক। তাঁরা দ্রুত শিশুটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের সাদা চাদর, জীবাণুনাশকের গন্ধ, ডাক্তারদের ব্যস্ত পদচারণা—এগুলো যেন তার শিশুমনের ওপর আরও কালো ছায়া ফেলে দিচ্ছিল।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয় লোকজন আনোয়ার হোসেনকে আটক করে ফেলে। পরে পল্লবী থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে গ্রেপ্তার করে। ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে, এই ঘটনায় পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে কিশোরীটিকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। কিন্তু শিশুটি প্রতিবারই ফিরিয়ে দিয়েছে তার লজ্জার প্রস্তাব। সম্ভবত সেই প্রত্যাখ্যানই তাকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল, এবং শেষ পর্যন্ত সে পাশবিক হয়েছিল। এখন সে কারাগারে, কিন্তু তার এই শাস্তি কি আদৌ সেই কিশোরীর মানসিক যন্ত্রণার তুলনায় কিছু?
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা পল্লবীর, বরং গোটা দেশের আত্মমর্যাদায় আঘাত হেনেছে। আমরা একটি সভ্য সমাজে বাস করি, যেখানে রাস্তার পাশের পুকুরে যেমন পদ্ম ফোটে, ঠিক তেমনি কোনো কোনো গলিতে জন্ম নেয় হিংস্র কুমির। প্রতিবেশী শব্দটি যেখানে নিরাপত্তার প্রতীক, সেখানে আনোয়ার হোসেন সেই বিশ্বাসকেই ভেঙে দিয়েছে। শিশুরা নিরাপদ নয়—এই বার্তা যেন সমাজের বুকে এক বিষফোঁড়ার মতো।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রায়শই দেখা যায় বেশিরভাগ ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে পরিচিত বা আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি আমাদের সন্তানদের যথাযথ সুরক্ষা দিতে পারছি? বাবা-মায়েরা কি তাদের মেয়েদের ‘ভয়’ শেখান, না ‘সতর্কতা’? আর সমাজ কীভাবে একটি শিশুকে তার নিজের শরীরের মালিক হতে শিক্ষা দেয়?
হাসপাতালের সেই করিডোরটি যেন চিৎকার করে উঠছিল এক নীরব আর্তনাদে। কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকদের কাছে জানতে চান তাদের সোনামণির অবস্থা। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল, কিন্তু মানসিক অবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর। তার দেহে যেমন ক্ষত, তেমনি তার মনে রয়েছে গভীর আঘাত—যার ব্যথা বলা যায় না, লেখা যায় না। সে এখন আর আগের সেই স্বাভাবিক মেয়েটি নেই; তার চোখে ভয়, তার স্বপ্নে দানব।
তার মা, যিনি কষ্টে জীবনযাপন করেন, তিনি বলেন, “আমার মেয়ে বাঁচুক, কিন্তু এই লজ্জা কীভাবে ভুলবে?”—এই প্রশ্ন যেন সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সবার জন্য সমান। সমাজের বিবেকের কাছে এই প্রশ্ন এখন উন্মুক্ত।
পল্লবী থানায় করা মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এই আইনে অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে তার জন্য এখনও অনেক পথ বাকি। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া, চিকিৎসা প্রতিবেদন জমা দেওয়া এবং প্রমাণ সংগ্রহ—এই প্রতিটি ধাপ কিশোরী ও তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আনোয়ার হোসেন নিজের অপরাধ স্বীকার করলেও তিনি ‘উসকানি’ বা ‘মানসিক ভারসাম্যহীনতা’র অজুহাত দিতে পারেন। কিন্তু এই অজুহাত তার অপরাধের ভয়াবহতাকে কোনোভাবেই হ্রাস করে না।
এই ঘটনা থেকে আমাদের সমাজকে অনেক শিক্ষা নিতে হবে।
প্রথমত, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সীমানা তৈরি করা প্রয়োজন, বিশেষ করে নাবালিকা মেয়েদের ক্ষেত্রে।
দ্বিতীয়ত, শিশুদের নিজেদের শরীর সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। ‘গুড টাচ’ এবং ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।
তৃতীয়ত, এই ধরনের অপরাধের শিকার হলে নীরব না থেকে সাহস করে আইনের আশ্রয় নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের উচিত সন্তানের প্রতি আস্থা রাখা, তাকে অপমান না করে বরং সাহস দেওয়া।
এছাড়া, প্রশাসনিকভাবে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও এই ধরনের অপরাধ ঠেকাতে ভূমিকা রাখা উচিত। নজরদারি বৃদ্ধি করা, নারী ও শিশু নির্যাতন সম্পর্কিত সচেতনতা কর্মসূচি চালানো এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
অনেক অভিভাবক মনে করেন পরিচিতরা নিরাপদ। কিন্তু অনেকে আবার ভুলে যান যে বেশিরভাগ ধর্ষণই সংঘটিত হয় আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের দ্বারাই। এই ঘটনা যেন সেই ভ্রম ধারণার দেয়াল ভেঙে দেয়। ‘চেনা’ মানে ‘সুরক্ষিত’ নয়—এটা এখন স্পষ্ট। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।
এ বিষয়ে শিশু মনোবিদরা বলেন, আক্রান্ত শিশুর প্রায়ই ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার’ (PTSD) দেখা দেয়। তার ঘুম হারায়, খাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং মানুষজন দেখলেই ভয় পায়। সমাজের কর্তব্য হলো সেই শিশুটিকে আগলে ধরা, তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।
কিশোরীটির চোখে অশ্রু, তার দেহে ক্ষত; কিন্তু আমরা তার পাশে দাঁড়ালে তো এই ক্ষত শুকিয়ে যেতে পারে। সম্ভবত তার ফিরে পাওয়ার স্বপ্নটি এখনও শেষ হয়নি, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র যদি তার পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে প্রতিটি নারী ও শিশু একদিন শিকার হবে।
পল্লবীর এই ঘটনা শুধু একটি সংবাদ নয়, এটি একটি দর্পণ। আমরা যে সমাজ গড়ছি, সেই সমাজের অন্ধকার দিক আমাদের দেখাচ্ছে এই ঘটনা। এখন সময় এসেছে কেবল আইনের কঠোরতা প্রয়োগের নয়, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তি মজবুত করার।
পুলিশি তদন্ত চলছে, মামলা হচ্ছে, আক্রান্তের চিকিৎসা চলছে। কিন্তু একটি শিশুর মানসিক চিকিৎসা হয়তো সারাজীবন চলবে। এই ঘটনার বিচার কেবল আদালতে নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের মনের আসনেও হওয়া উচিত। কিশোরীটি যদি আজ ফিরে এসেও ঘুমাতে পারে, তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি তার জন্য নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করে দিতে পারলাম?
রাত পেরিয়ে সকাল হবে, পল্লবীর গলিতে আবারও আলো ফুটবে। কিন্তু এই আলো কি সেই কিশোরীর চোখে ফিরিয়ে আনতে পারবে তার হারানো হাসি? আমরা জানি না। যা জানি, তা হলো—আমরা সবাই দায়ী। আমরা সবাই সচেতন। শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ; তাদের সুরক্ষা আমাদের একমাত্র দায়িত্ব। “পল্লবীতে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন গ্রেপ্তার” —এই শিরোনাম যেন প্রতিটি মানুষের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের আরও সজাগ হতে হবে, আরও মানবিক হতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবেই না একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ গড়ে উঠবে।