ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঘটনাটি যেন এক প্রতীকী চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রি করে যে আকবর নিজের ও পরিবারের সংসার চালাতেন, সেই আকবরকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিতে হলো। আরো বেদনাদায়ক বিষয় হলো, মৃত্যুই যেন তার জন্য মুক্তি হয়ে এলো—অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে মুক্তি। একই এলাকার আরেক মুসলিম মাইমুর উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন এবং এখন বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করছেন।
ভীতসন্ত্রস্ত মাইমুর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, হামলার মুহূর্তে আমি শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম। তারা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে আমাকে ধাওয়া করছিল। আমি কোথায় লুকাব, তা বুঝতে পারছিলাম না। থানায় গেলে যে পুলিশ আমাকে সাহায্য করবে না, সেটা নিশ্চিত ছিলাম। তারপরও থানায় গিয়ে উঠলাম। পুলিশ তখন আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে গরু পাচার মামলার আসামি বানিয়ে দিল। তখন বুঝতে পারলাম, আমাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে ভারতে বসবাস করা সবচেয়ে বড় অপরাধ! মাইমুরের এই অভিজ্ঞতা এখন ভারতের ২৫ কোটি মুসলিমের জীবনের প্রতিচ্ছবি। অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে জীবন পার হচ্ছে দেশটির মুসলিমদের। হতাশা আর আতঙ্ক এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কখন যে হিন্দু জঙ্গিদের হাতে প্রাণ যায়! মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় অথবা বেঁচে থাকার অবশিষ্ট অবলম্বনটাও জয় শ্রীরাম স্লোগানধারীদের বুলডোজারের নিচে চাপা পড়ে!
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা মুসলিমদের ওপর নানামুখী নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলছে। তথাকথিত গোরক্ষা গোষ্ঠীসহ উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হত্যাসহ বহুমাত্রিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। প্রতিনিয়ত প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে তাদের। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি অনেক রাজ্যে তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে টার্গেটে পরিণত হয়েছে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মাদরাসা, দরগা থেকে শুরু করে কবরস্থান পর্যন্ত। গত দেড় মাসে মসজিদসহ অন্তত ২৩টি ধর্মীয় স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা, পাবলিক প্লেসে নামাজ বা মসজিদের মাইক ব্যবহারের মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে কড়াকড়ি তৈরি হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে মুসলিম শাসকদের ইতিহাস বাদ দেওয়া এবং ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে মুসলিম নির্যাতনের এসব তথ্য সামনে এসেছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। মুসলিমদের হত্যাসহ নির্যাতনের ঘটনা ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কখনোই আলাদা করে নথিভুক্ত করে না। দেশটির গণমাধ্যমগুলো বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে যায়। তাই সেখানে মুসলিম নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র অজানাই থেকে যাচ্ছে।
সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’-এর তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে ভারতে অন্তত ১৭ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক ঘৃণাজনিত কারণে হিন্দু চরমপন্থিরা ১৩ জনকে হত্যা করে। বিতর্কিত ‘এনকাউন্টার’ এবং হেফাজতে নির্যাতনে চারজনকে হত্যা করা হয়। ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকারের তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে ভারতজুড়ে ৫০টি মুসলিম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ২৭টি হত্যাকাণ্ড চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর গণপিটুনি ও আক্রমণের কারণে ঘটে এবং ২৩টি ঘটে পুলিশি হেফাজতে।
বিজেপি সমর্থিত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের মতো হিন্দু আধিপত্যবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো দেশজুড়ে, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় অবাধে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনগুলোর সদস্যরা বিভিন্ন অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আক্রমণ এবং হত্যা অব্যাহত রেখেছে। পাহালগাম হামলা এবং তার ফলস্বরূপ পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর দেশজুড়ে হাজার হাজার মুসলমানকে যথেচ্ছভাবে গ্রেপ্তার করে কর্তৃপক্ষ। ভারতজুড়ে হাজার হাজার বাংলাভাষী মুসলমানকে আটক করা হয় এবং গুজরাট ও আসামে তাদের বসতিগুলো নির্বিচারে ভেঙে দেওয়া হয়। এছাড়া একটি নতুন ‘পুশব্যাক’ নীতির অধীন যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই অন্তত এক হাজার ৮৮০ জনকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়, যাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।
ভারতে গত ৪৫ দিনে অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এই উচ্ছেদ অভিযানের অধিকাংশই বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে চালানো হয়। এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো মূলত দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং হরিয়ানা রাজ্যে চালানো হয়েছে। দিল্লির মঙ্গলপুরীতে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ‘দরগাহ পঞ্চ পীরান’ ভেঙে ফেলা হয়। এছাড়া রাজস্থানের জয়পুরের নূরানি মসজিদ, মুম্বাইয়ের বান্দ্রা ও গোরেগাঁওয়ের বেশ কয়েকটি মসজিদ ও দরগাহ এবং বারাণসীর গঞ্জ শাহিদা মসজিদও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওয়াকফ বোর্ড এবং স্থানীয় তত্ত্বাবধায়কদের অভিযোগ, আইনি বাধা এবং স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কোনো পূর্ব নোটিস ছাড়া তাড়াহুড়া করে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকারকর্মী সংগঠন ‘জাস্টিস ফর অল’ ভারতে মসজিদ ভাঙার ঘটনা দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সম্ভল, বারাণসী এবং জয়পুরে সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। ১০০০ বছরের পুরনো মসজিদ থেকে শুরু করে ২০০ বছরের পুরনো দরগাহ পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতের কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই ধ্বংসযজ্ঞের ঢেউ গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। মে মাস থেকে ছয়টি রাজ্য জুড়ে মসজিদ, দরগাহ, ঈদগাহ, মাদরাসাসহ অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বারাণসীর ১০০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক মসজিদ গঞ্জ শাহিদা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, পাঁচদিনের ব্যবধানে তিনটি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই প্রবণতা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের চোখে সমান অধিকার নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সংগঠনটি বিশেষভাবে সম্ভলের মসজিদ মুস্তফা কাদরি, বারাণসীর শহীদ আজগাইব মসজিদ এবং জয়পুরের নূরানি মসজিদ ধ্বংসের কথা উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে এবং সতর্ক করেছে যে, ক্রমবর্ধমান ভাঙচুরের ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার শিকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে, ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসনাধীন রাজ্যের মতো। শুভেন্দু দায়িত্ব গ্রহণ করেই পশ্চিমবঙ্গে হিমন্ত ও যোগীর বুলডোজার ও উচ্ছেদ মডেলের পথ বেছে নিয়েছেন। মুসলিম বসতিস্থলে চলছে বুলডোজার, তপশিয়া, তিলজলার বহুতলে বুলডোজার অ্যাকশন। কারণ, এগুলো নাকি অবৈধ আনপ্ল্যানড নির্মাণ। তপশিয়ায় বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইরফান এখন সহায় সম্বলহীন। রাতারাতি ফ্ল্যাট হারিয়ে বাস করছেন তিলজলার ছোট্ট ঘুপচি ঘরে। তিনি জানালেন, পুরো কলকাতা শহরজুড়ে অবৈধ নির্মাণ। প্ল্যান নেই সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। কিন্তু মুসলমান, সেজন্য আমাদের বাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে দিল। আমাদের মাল-সামান সরিয়ে নেওয়ার সময়টুকু দেয়নি প্রশাসন। বিজেপি সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই কাজ করিয়েছেন। আমরা এখন কী করব জানি না! এ রকম ইরফানের সংখ্যা প্রায় ৩০ জনের বেশি যারা তপশিয়ায় বুলডোজার অ্যাকশনে বাড়িছাড়া হয়েছেন। তারা কেউ আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ বা পাড়ি দিয়েছেন নতুন বাসার খোঁজে। তাদের মনে প্রশ্ন, বড়বাজার তো সবচেয়ে ঘিঞ্জি আনপ্ল্যানড এলাকা। সেখানে বুলডোজার চলছে না কেন? ওখানে বিজেপি জিতেছে, ওখানে হিন্দু মারোয়াড়ি, গুজরাতিরা থাকে বলে বুলডোজার যাবে না?
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস-এর একটি বিস্তৃত রিপোর্ট বলছে, মে মাসের ৪ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে রাজ্যের অন্তত আটটি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা, ভাঙচুর করা হয়েছে। কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা মেট্রো, মুর্শিদাবাদ এবং হাওড়ার মতো জেলাগুলোতে সব মিলিয়ে ৩৪টি এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অসহিষ্ণুতার মর্মান্তিক পরিণতি হিসেবে অন্তত দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে কোচবিহারের গোসানিমারিতে একটি মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে এক মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এই ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে অন্তত ৫৪টি সম্পত্তি—যার মধ্যে বসতবাড়ি, দোকানপাট এবং দলীয় কার্যালয় রয়েছে—আক্রমণ বা ধ্বংসের শিকার হয়েছে এবং শারীরিকভাবে বা অন্য কোনো উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন ব্যক্তি। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে মুসলিম মালিকানাধীন হোটেল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, আমতায় বেছে বেছে ১৫টি বাড়িতে ভাঙচুর চালানো এবং কলকাতার হকার ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো এই আগ্রাসনের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। শুধু তাই নয়, অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখাও দেখা গেছে, যেখানে হাওড়া, কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জোরপূর্বক গবাদি পশুর বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং মাংসের দোকানগুলোতে অবাধে হামলা চালানো হয়েছে।
ধর্মীয় পরিচয় ও মৌলিক অধিকারের ওপর এই আঘাত কেবল ধ্বংসলীলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছে সংস্কৃতির আঙিনাতেও। কোচবিহারের তিনটি মসজিদে হামলা, জয় শ্রীরাম স্লোগান তুলে ধর্মীয় স্থানে আক্রমণ এবং হাওড়ার বীরশিবপুরে এক ইমামকে হেনস্তা করার মতো ঘটনাগুলো এক গভীর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এই বিদ্বেষের আঁচ এসে পড়েছে, যার জ্বলন্ত প্রমাণ হাওড়ার ডোমজুড়ে আজাদ হিন্দ কলেজে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরতে বাধা দেওয়ার ঘটনা। এর পাশাপাশি, উত্তর ২৪ পরগনায় ‘এন পাড়া মসজিদ বাড়ি রোড’-এর নাম বদলে ‘নেতাজি পল্লী রোড’ বা ‘সিরাজউদ্দৌলা উদ্যান’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘শিবাজী উদ্যান’ করা, তা মূলত একটি সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব মুছে ফেলারই নামান্তর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এই খবরগুলো খুব একটা জায়গা না পেলেও, স্থানীয় সূত্র ও অধিকার রক্ষায় সোচ্চার সংগঠনগুলোর মতে, এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘাত নয়, বরং রাজ্যে তৈরি হওয়া এক ভয়াবহ ও বিস্তৃত বিদ্বেষমূলক পরিবেশেরই বাস্তব প্রতিফলন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মুসলিমদের ক্রমবর্ধমানভাবে নিপীড়নমূলক শাস্তি দিচ্ছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত বেশ কয়েকটি রাজ্যে কর্তৃপক্ষ আইনি অনুমোদন ছাড়াই মুসলিমদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি ভেঙে দিয়েছে এবং অতি সম্প্রতি, একটি হিন্দু উৎসবে বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগ তুলে মুসলিম পুরুষদের প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যের কর্তৃপক্ষ এক ধরনের সংক্ষিপ্ত শাস্তি হিসেবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালাচ্ছে। আইনের শাসনকে নির্লজ্জভাবে উপেক্ষা করে কর্মকর্তারা জনগণকে এই বার্তা দিচ্ছেন যে, মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য করা এবং তাদের ওপর আক্রমণ চালানো যেতে পারে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বলেছে, গুজরাট রাজ্যের খেদা জেলায় একটি হিন্দু উৎসবের সময় ‘গরবা’ নামক একটি আনুষ্ঠানিক নৃত্যে পাথর ছোড়ার অভিযোগ তুলে পুলিশ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। বন্দুকের হোলস্টার পরা বেসামরিক পোশাকধারী এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বেশ কয়েকজন মুসলিম পুরুষকে লাঠি দিয়ে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করতে দেখা যায়, যখন অন্য কয়েকজন কর্মকর্তা পুরুষদের একটি বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছিলেন। কিছু সরকারপন্থি টেলিভিশন সংবাদ নেটওয়ার্কে দেখানো এবং এমনকি প্রশংসিত ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন উর্দিধারী পুলিশ কর্মকর্তা বেত্রাঘাত দেখছেন এবং অভিযুক্তদের লাঠি দিয়ে মারছেন, আর নারী-পুরুষ একটি দল উল্লাস করছে ও হাততালি দিচ্ছে। মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের মান্দসৌর জেলায় একটি গরবা অনুষ্ঠানে পাথর ছোড়ার অভিযোগে ১৯ জন মুসলিম পুরুষের বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যাচেষ্টা ও দাঙ্গার মামলা দায়ের করে এবং তাদের মধ্যে সাতজনকে আটক করে। দুই দিন পর, কোনো আইনি অনুমোদন ছাড়াই কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে নির্মিত বলে দাবি করে ওই পুরুষদের মধ্যে তিনজনের বাড়ি ভেঙে দেয়।
মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের খারগোন জেলা, গুজরাট রাজ্যের আনন্দ ও সবরকান্থা জেলা এবং দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী মহল্লায় কর্তৃপক্ষ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের জবাবে নির্বিচারে সম্পত্তি ভেঙে দেয়, যার বেশিরভাগই ছিল মুসলিমদের মালিকানাধীন। হিন্দু উৎসবের সময় সশস্ত্র হিন্দু পুরুষদের ধর্মীয় শোভাযাত্রা মুসলিম এলাকা দিয়ে যাওয়ার পর এই সংঘর্ষগুলো ঘটেছিল। লোকগুলো মসজিদের সামনে মুসলিমবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিল, অথচ পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। কর্তৃপক্ষ স্থাপনাগুলোকে অবৈধ বলে দাবি করে এই ধ্বংসযজ্ঞকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের কার্যকলাপ ও বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সময় সহিংসতার জন্য মুসলমানদের দায়ী করে তাদের ওপর সম্মিলিত শাস্তি আরোপের উদ্দেশ্যেই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। মধ্যপ্রদেশের বিজেপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাথর ছোড়ার সঙ্গে জড়িত বাড়িগুলোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। মধ্যপ্রদেশের খারগোনে কর্তৃপক্ষ অন্তত ১৬টি বাড়ি এবং ২৯টি দোকান গুঁড়িয়ে দিয়েছে। জেলা কালেক্টর, যিনি একজন স্থানীয় প্রশাসক, তিনি বলেন, অপরাধীদের একে একে খুঁজে বের করা একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, তাই দাঙ্গাকারীদের শিক্ষা দিতে আমরা দাঙ্গা হওয়া সমস্ত এলাকা খতিয়ে দেখেছি এবং সমস্ত অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দিয়েছি।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ক্রমশ এমনভাবে কাজ করছে যেন তাৎক্ষণিক শাস্তি একটি রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। যদি ভারত সরকার সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক আইন, নীতি এবং পদক্ষেপগুলো প্রত্যাহার করতে অবিলম্বে ব্যবস্থা না নেয়, তবে আইনের শাসনের জায়গায় বুলডোজার আর লাঠির রাজত্ব বসবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন জে. র্যাপ গত ৪ মে প্রকাশিত এক রিপোর্টে ভারতে মুসলিমদের ওপর চালানো নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তাতে তিনি বলেন, ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্যের একটি চলমান এবং ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মানবাধিকার সংস্থা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে নথিভুক্ত করা হয়েছে। দেশটিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন সংঘটিত হয়েছে, যার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। মুসলমানরা ভারতের অভ্যন্তরে একটি নির্যাতিত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের ২০২২ সালের প্রতিবেদনের মতোই, আমরা এবারও আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেয়েছি, বিশেষত এমনসব কর্মকাণ্ড যা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বর্ণবৈষম্যের পর্যায়ে পড়তে পারে, কারণ এর মধ্যে একটি জাতিগোষ্ঠীর ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়ন ও আধিপত্যের প্রাতিষ্ঠানিক শাসনের অধীনে সংঘটিত অমানবিক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আসামের সহিংসতায় অন্তত ১৭,০০০ জনকে তাদের বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং ২,৪৫০ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ব্যাক’ বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তরের সমতুল্য হতে পারে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী শর্মা একাধিক প্রকাশ্য বিবৃতিতে বাংলাভাষী মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা কার্যকরভাবে সহিংস সংঘাতকে উৎসাহিত করেছে। আমরা তার প্রকাশ্য বক্তব্যকে গণহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধিকারী হিসেবেই দেখছি।
আসাম এবং উত্তর প্রদেশ উভয় রাজ্যেই পুলিশের দ্বারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘এনকাউন্টার কিলিং’-এর ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নিহতদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। কর্মকর্তাদের আত্মরক্ষার দাবি কোনো তদন্ত এবং জবাবদিহিতার কোনো সম্ভাবনা ছাড়াই সর্বদা গৃহীত হয়। বরং, হত্যাকারীদের প্রশংসা করা হয় এবং পুলিশের উচ্চপদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। আসামে শর্মা সরকারের প্রথম তিন বছরে এই ধরনের ঘটনায় ৮৩ জনকে হত্যা করা হয়েছিল এবং উত্তর প্রদেশে আদিত্যনাথ সরকারের প্রথম সাত বছরে ২৬৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। নিপীড়নমূলক ও শাস্তিমূলক পুলিশি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সংঘটিত এই প্রাণঘাতী সহিংসতা, যা মুসলিমদের লক্ষ্য করে করা হয় এবং প্রতিকারের অভাবে আরো জটিল হয়ে ওঠে, তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নিপীড়নের পর্যায়ে পড়ে। উত্তর প্রদেশের পুলিশও ‘অপারেশন ল্যাংলা’ নামে পরিচিত একটি নতুন পুলিশি পদ্ধতি গ্রহণ করছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের আইন প্রয়োগকারী পদক্ষেপের সময় ভুক্তভোগীকে হত্যা না করে বরং পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ করে দেয় ‘হাফ-এনকাউন্টার’ ঘটনা নামে পরিচিত। আমরা শুধু ২০২৪ সালেই ৫৬ জন সাম্প্রতিক ভুক্তভোগীর তথ্য গণনা করেছি। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্যাতনের পর্যায়ে পড়তে পারে, কারণ এতে রাষ্ট্রীয় এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভুক্তভোগীদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর শারীরিক যন্ত্রণা বা কষ্ট চাপিয়ে দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এবং এর দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞরা ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছে, যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো বর্ণবৈষম্য নিরসন কমিটির ‘আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড আর্জেন্ট অ্যাকশন’ পদ্ধতি। বস্তুত, ২০২০-২০২৬ সালের মধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অপব্যবহারের বিষয়ে ৯১টি প্রতিবেদন জমা পড়েছে। এর কোনোটিরই তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। কারণ হলো—ভারত তার চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলো, মানবাধিকার পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিজস্ব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ব্যাপক সহিংসতার দিকে ধাবিত হওয়ার সূচনা যুদ্ধ দিয়ে হয় না। এর শুরু হয় বিভিন্ন ন্যারেটিভ তৈরি এবং ধারণা থেকে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে তৈরি ন্যারেটিভ একসময় বলে দেয়, স্বাভাবিকভাবে তাদের সঙ্গে সহাবস্থান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় এমনসব আইনি ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ, যা জনগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে, অধিকারের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে জনসংখ্যাগত বা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। পরবর্তীকালে এই প্রক্রিয়াগুলো জাতিগত নির্মূল এবং চূড়ান্তভাবে গণহত্যায় রূপ নেয়। এর উদাহরণ আমরা দেখতে পাই রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়া এবং মিয়ানমারে। ভারতে চলমান মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এখনই সময়। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি দেশটির মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে না পারে তাহলে আগামী দিনে রুয়ান্ডা বা মিয়ানমারের মতো সংখ্যালঘু মুসলিম নিধনের মর্মান্তিক চিত্র দেখতে হতে পারে।
দুর্ভাগ্যবশত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল ব্যাপক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আসাম, উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এগুলো এমন একটি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়, যা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে আরো সুপরিকল্পিত সহিংসতার রূপ নিতে পারে। ভারতে যা এড়ানো সম্ভব, তা যাতে অনিবার্য হয়ে না ওঠে, সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভারতীয় মুসলিমরা আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। তাদের ধর্মীয় পরিচয়ই যেন এখন তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো যখন দিনের পর দিন মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিকার দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বরং অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নিজেই নির্যাতনের অংশীদার হয়ে উঠছে। বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া, মসজিদ-মাদরাসা ভাঙচুর করা, হিজাব পরার অধিকার কেড়ে নেওয়া, নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া—এসব যেন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, সর্বত্র মুসলিমরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জির মতো আইনগুলো মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। রাজনীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব কমে আসছে, ইতিহাস থেকে মুসলিম শাসকদের নাম মুছে ফেলা হচ্ছে, শহরের নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে—এসব যেন এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ, যার লক্ষ্য ভারত থেকে মুসলিম অস্তিত্ব মুছে ফেলা।
পশ্চিমবঙ্গের তপশিয়া, তিলজলার মতো এলাকায় বুলডোজার অ্যাকশনে শতশত পরিবার গৃহহীন হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একমাত্র অপরাধ—তারা মুসলিম। কলকাতার বড়বাজারের মতো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় যদিও অবৈধ নির্মাণ রয়েছে, সেখানে বুলডোজার চলে না। বৈষম্য এতটাই স্পষ্ট যে, তা আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করছে, ভারতের মুসলিমরা যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, জাস্টিস ফর অল—সবাই একবাক্যে স্বীকার করছে, ভারতের মুসলিমরা এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও তাদের প্রতিবেদনে এই বিষয়টি তুলে ধরেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেন উদাসীন? রুয়ান্ডা, মিয়ানমার, যুগোস্লাভিয়ায় যখন গণহত্যা হয়েছিল, তখন বিশ্ব নীরব ছিল না। সেখানে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ হয়েছে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে কেন এই নীরবতা? কেন ভারতের ২৫ কোটি মুসলিমের দুর্দশা বিশ্ববাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়? হয়তো রাজনৈতিক স্বার্থ, হয়তো অর্থনৈতিক সম্পর্ক—নানা কারণে ভারতের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মুখ বন্ধ রাখছে। কিন্তু এই নীরবতা একদিন ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীরা সতর্ক করছেন, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার শুরুটা হয় ন্যারেটিভ তৈরি থেকে। যখন একটি সম্প্রদায়কে ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন ধীরে ধীরে জনমনে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ তৈরি হয়। এরপর আসে আইনি বৈষম্য, প্রশাসনিক নির্যাতন, এবং শেষ পর্যন্ত গণহত্যা। ভারতের ক্ষেত্রেও এই ধারাটি স্পষ্ট। বিজেপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো মুসলিমদের বিরুদ্ধে একের পর এক ন্যারেটিভ তৈরি করছে। তাদের বলা হচ্ছে ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির হুমকি’, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক’—এসব কথা যখন বারবার বলা হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনেও বিদ্বেষ তৈরি হয়। আর সেই বিদ্বেষ যখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তখন তা সহিংসতায় রূপ নেয়।
পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাগুলো তারই উদাহরণ। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় মুসলিমদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত জাতিগত নির্মূলের অংশ। জয় শ্রীরাম স্লোগান দিয়ে মুসলিমদের ধাওয়া করা, তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা, ব্যবসাবাণিজ্য ধ্বংস করা—এসব যেন এক মহড়া। যে সমাজে একজন মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীন বোধ করে, যে সমাজে সংখ্যালঘুদের প্রতি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চলমান, সেই সমাজ কখনো গণতান্ত্রিক হতে পারে না। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টতই তা প্রমাণ করছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনই সোচ্চার হওয়ার সময়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই ভয়াবহ চিত্রের বিরুদ্ধে নীরব থাকা যাবে না। ভারত সরকারকে তাদের চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা মনে করিয়ে দিতে হবে। জাতিসংঘ ও তার বিভিন্ন সংস্থাকে আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। কারণ আজ যদি ভারতের মুসলিমদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কণ্ঠ না ওঠে, তাহলে আগামীদিনে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ভারতের মুসলিমরা আজ যে পথে হাঁটছেন, তা একাকীত্বের পথ। তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই—না ভারত সরকার, না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। কিন্তু এই নীরবতা ভাঙার সময় এখনই। কারণ মানবতা যখন বিপন্ন হয়, তখন সব সীমানা, সব পরিচয়, সব রাজনীতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। ভারতের মুসলিমদের সঙ্গে যা ঘটছে, তা শুধু ভারতের সমস্যা নয়, এটি মানবসভ্যতার জন্য লজ্জার বিষয়।
আমরা যদি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার মতো মূল্যবোধে বিশ্বাস করি, তাহলে অবশ্যই ভারতের মুসলিমদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের দুর্দশার কথা বলতে হবে, তাদের অধিকারের জন্য কণ্ঠ তুলতে হবে। কারণ নীরবতা হলো অন্যায়ের সঙ্গী। আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
ভারতের মুসলিমরা আজ সংকটে। কিন্তু এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ আছে—আন্তর্জাতিক চাপ, গণমাধ্যমের সচেতনতা, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা—এসবের সম্মিলিত প্রয়াসে হয়তো একদিন এই নির্যাতন বন্ধ হবে। ততদিন পর্যন্ত, ভারতের মুসলিমরা তাদের অসহনীয় জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাবে, প্রতিদিন প্রাণের ভয়ে, প্রতিদিন নির্যাতনের শঙ্কায়। এই বাস্তবতা যেন ভুলে না যাই আমরা। কারণ আজকের ভারতের মুসলিমরা, হয়তো আগামীকালের ইতিহাসের সেই পাতায় লেখা থাকবে, যেখানে মানবতা ব্যর্থ হয়েছিল, যেখানে নীরবতা বিজয়ী হয়েছিল, যেখানে অত্যাচারীদের হাতে নিরীহ মানুষজন প্রাণ দিয়েছিল। এই ইতিহাস যেন আর না লেখা হয়, সেজন্যই এখনই সময় সোচ্চার হওয়ার।