ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। সোমবার (৬ জুলাই) ভোরে চালানো এই হামলায় আরও শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং রাজধানীর অসংখ্য আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহের ভয়াবহ হামলার মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই নতুন আক্রমণ চলল, যা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলন শুরুর ঠিক আগে এই হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তার আহ্বান জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে ।
রাশিয়ার এই হামলায় কিয়েভের পোদিলস্কি জেলার একটি নয়তলা আবাসিক ভবন প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা সারা দিন ধরে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালিয়ে মৃতদেহ উদ্ধার ও আহতদের সন্ধান করেছেন। কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো জানিয়েছেন, হামলায় রাজধানীতে ১৮ জন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়েছেন । তিনি আরও জানান, রাশিয়া ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫১টি আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহার করেছে এই হামলায় । কিয়েভের আশপাশের এলাকা ও দক্ষিণ-পূর্বের জাপোরিঝিয়া শহরেও হামলায় নিহতের সংখ্যা ১০ জন ছাড়িয়েছে ।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার ছোড়া ২৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ঠেকাতেও তারা সক্ষম হয়নি । যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকটকে এ ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের বিশ্বব্যাপী সরবরাহ এতটাই সীমিত যে ইউক্রেনের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে । বছরে মাত্র ৬৫০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরি হয়, অথচ রাশিয়া প্রতিমাসে প্রায় ১২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে । এর বিপরীতে, ইউক্রেন ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ৯০ শতাংশের বেশি ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতার মূল ঘাটতি রয়েছে ।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই হামলাকে ‘বর্বর আক্রমণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র যত দিন মিত্রদের মজুতে পড়ে থাকবে, তত দিন রাশিয়া কেবল আবাসিক ভবন ধ্বংস করতে উৎসাহ পাবে। তিনি আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে এ বিষয়ে ‘শক্তিশালী সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্যাট্রিয়ট উৎপাদনের লাইসেন্স চেয়েছেন, যাতে ইউক্রেন নিজেই এই অস্ত্র তৈরি করতে পারে । ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে স্বীকার করেছেন যে মিত্রদের কাছে সীমিত সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর মজুত রয়েছে, তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট সরবরাহ অব্যাহত রাখবে ।
এদিকে, ইউক্রেনও রাশিয়ার ভেতরে পাল্টা হামলা জোরদার করেছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা সাইবেরিয়ার ওমস্ক অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে সফল হামলা চালিয়েছে, যা ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, এই অভিযানে ইউক্রেনের উন্নত ‘ফায়ার পয়েন্ট’ ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে এবং এখন সাইবেরিয়াও ইউক্রেনের নির্ভুল হামলার আওতায় এসেছে । রাশিয়া দাবি করেছে, তারা রাতভর ৫০০টির বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে । এই পারস্পরিক হামলার মধ্যেই আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলন শুরু হচ্ছে, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার উপায় নিয়ে বৈঠকের কথা রয়েছে ।











