দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) পাঁচটি অনুষদে অবশেষে স্থায়ীভাবে পাঁচজন ডিন নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় আইন, আইন উপদেষ্টার মতামত, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং আদালতে দায়ের করা সিভিল পিটিশনের আলোকে উপাচার্যের অনুমোদনে এই নিয়োগ কার্যকর করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এ সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার (৬ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নুরুল করিম চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়। পরে তিনি গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নতুন নিয়োগ অনুযায়ী বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সজল চন্দ্র মজুমদার। কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন হয়েছেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শামসুজ্জামান মিলকী। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজাউল করিম। প্রকৌশল অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদুল হাছানকে। এছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন হয়েছেন ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এমদাদুল হক।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, নিয়োগের তারিখ থেকে আগামী দুই বছর তাঁরা নিজ নিজ অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এর আগে গত ১৮ মে আইন অনুষদের ডিন হিসেবে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক বেলাল উদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি অনুষদেই স্থায়ী ডিন নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভাগভিত্তিক পালাক্রম (Rotation Policy) কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন প্রশাসনের সময় ডিন নিয়োগে পালাক্রমের ব্যত্যয় ঘটেছিল। সেই অসঙ্গতিগুলো বিবেচনায় নিয়ে যেসব বিভাগ পূর্বে বঞ্চিত হয়েছিল, সেখান থেকেই এবার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, পালাক্রম নির্ধারণের পর সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ডিন নির্বাচন করা হয়েছে। তবে যেসব শিক্ষক ইতোমধ্যে ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অথবা যাঁদের বিরুদ্ধে আইনি জটিলতা রয়েছে, তাঁদের পরিবর্তে পরবর্তী জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন কোনো প্রশাসনিক বা আইনি বিতর্ক এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নুরুল করিম চৌধুরী বলেন, অতীতে ডিন নিয়োগের ক্ষেত্রে একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটেছিল। বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, দায়ের করা সিভিল পিটিশন, আইন উপদেষ্টার মতামত এবং কমিটির সুপারিশ বিবেচনা করেই স্থায়ী ডিন নিয়োগ দিয়েছে। আইন অনুষদে কোনো জটিলতা না থাকায় সেখানে আগেই অধ্যাপক বেলাল উদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক হায়দার আলী প্রশাসনের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ছাড়াই ছয়টি অনুষদে অন্তর্বর্তীকালীন ডিন নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ববর্তী প্রশাসনের দেওয়া সেই নিয়োগ বাতিল করেন। এরপর ২০ মে পাঁচটি অনুষদে নতুন করে অন্তর্বর্তীকালীন ডিন নিয়োগ দেওয়া হয় এবং জানানো হয় যে আইন উপদেষ্টার মতামত না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা উপাচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সে সময় বিজ্ঞান অনুষদে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক জাকির ছায়াদউল্লাহ খান, প্রকৌশল অনুষদে আইসিটি বিভাগের অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকারকে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
অবশেষে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আইনি পর্যালোচনা এবং নীতিগত যাচাই শেষে স্থায়ী ডিন নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই নিয়োগ ভবিষ্যতে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং অনুষদগুলোর শিক্ষা, গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে।


