বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। নতুন অর্থবছর থেকে গবেষণা অনুদান আর সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হবে না; বরং গবেষণা প্রকল্পের অর্থ কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। সরকারের এই নতুন নীতিকে কেন্দ্র করে দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও প্রশাসন মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত গবেষণার স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের গবেষণা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ইউজিসির দাবি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে গবেষণা অর্থায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
ইউজিসি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট ও গবেষণা অনুদান সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি অনুদান ইউজিসির মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। নতুন নীতির আওতায় গবেষণা তহবিলের ব্যবহারও সরাসরি ইউজিসির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে একই ধরনের গবেষণায় দ্বৈত অর্থায়ন কমবে এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গবেষণা পরিচালনা সহজ হবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তাঁর মতে, গবেষণা অনুদান যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে ইউজিসির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিকল্পনা, বিষয় নির্বাচন এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক কাঠামোর অংশ। এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হলে গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অনেক গবেষক নতুন প্রকল্প গ্রহণে আগ্রহ হারাতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা অনুমোদিত হয়েছে, যার বড় অংশই সরকারের অনুদান। তবে আগের অর্থবছরে গবেষণার জন্য যে আলাদা বরাদ্দ ছিল, নতুন নীতির কারণে এবার সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, গবেষণা খাতে সরাসরি বরাদ্দ না থাকায় গবেষণা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গবেষণা অনুদান বন্ধ করা হয়নি; কেবল অর্থ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে এবং বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা মূল্যায়নের পর প্রয়োজন হলে নীতিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে।
এদিকে ইউজিসি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে মোট ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। কমিশনের দাবি, নতুন ব্যবস্থায় গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং ব্যয় পর্যবেক্ষণ আরও স্বচ্ছ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইতোমধ্যে গবেষণা পরিকল্পনা, খাতভিত্তিক ব্যয় এবং প্রকল্পের প্রস্তাব দ্রুত কমিশনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসকরাও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নিজস্ব বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে গবেষণার মান এবং প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রশাসনিক ধাপ যুক্ত হলে গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ও বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য অধ্যাপক সামিনা লুৎফা প্রশ্ন তুলেছেন, যখন শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, তখন গবেষণা অর্থায়ন কেন আরও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, গবেষণার প্রকৃতি ও প্রয়োজন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন। তাই স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হলে গবেষণার বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে গবেষণা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অনুদানের যথাযথ ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নের মান এবং গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ অতীতে একাধিকবার সামনে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, গবেষণা বরাদ্দের ব্যবহার আরও কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক করতে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের গবেষণা খাতেও ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক ডেটাবেজ স্কোপাসে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে দেশের গবেষকেরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বিশ্বের শীর্ষ গবেষকদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন, আর বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও আন্তর্জাতিক গবেষণা পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ করছেন। এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গবেষণা অর্থায়ন যেন দ্রুত, স্বচ্ছ এবং গবেষকবান্ধব হয়—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, গবেষণা তহবিল কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। এতে একই ধরনের গবেষণায় পুনরাবৃত্তি কমানো, জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক গবেষণায় বিনিয়োগ এবং ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা এবং গবেষকদের স্বাধীনভাবে গবেষণা পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী ৯ জুলাই ইউজিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেশের শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠকের ফলাফলই নির্ধারণ করতে পারে গবেষণা অর্থায়নের নতুন কাঠামো বর্তমান রূপে থাকবে, নাকি সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে এতে পরিবর্তন আনা হবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং একাডেমিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, গবেষণা অর্থায়নের কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যাতে সরকারের নজরদারি যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন গবেষণা পরিবেশও অক্ষুণ্ন থাকে।

