শ্রীলঙ্কার নেগোম্বো কারাগারে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই মাদকচক্রের বন্দিদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ২৬ জন নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সাতজন কারারক্ষী রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটিকে শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে প্রাণঘাতী কারাগার দাঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, রোববার (৬ জুলাই) রাত থেকে নেগোম্বো কারাগারের ভেতরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধচক্রের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কারাগারের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র এবং শারীরিক হামলার ঘটনা ঘটে।
নেগোম্বো হাসপাতালের পরিচালক ডা. পুষ্পা গামলাথ জানান, সংঘর্ষের পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২৩টি মরদেহ আনা হয় এবং শতাধিক আহত ব্যক্তি চিকিৎসা নেন। গুরুতর আহত অন্তত ১৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী কলম্বোর জাতীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে আরও তিনজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে পৌঁছায়।
শ্রীলঙ্কার বিচারমন্ত্রী হারশানা নানায়াক্কারা গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, কারাগারের অভ্যন্তরে সক্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলোকে পৃথকভাবে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নিহতরা বন্দি নাকি অপরাধচক্রের সদস্য—এ মুহূর্তে সেটি মুখ্য বিষয় নয়; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন প্রাণহানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সংঘর্ষ চলাকালে কারাগারের নারী ওয়ার্ডের কয়েকজন বন্দি ছাদে উঠে নিরাপত্তা ও মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এ সময় ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে কয়েকজন নারী বন্দি আহত হন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।
ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে শ্রীলঙ্কা সরকার অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তদন্তে সংঘর্ষের সূত্রপাত, অস্ত্রের উৎস এবং নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে।
কারা বিভাগের মুখপাত্র চামিন্দা গাজানায়াকে জানিয়েছেন, সংঘর্ষে কোনো বিদেশি বন্দি হতাহত হননি। তিনি বলেন, নেগোম্বো কারাগারে মাদক পাচারের অভিযোগে আটক এক ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন, তবে তিনি সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন।
সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার সকাল থেকেই কারাগারের বাইরে বন্দিদের স্বজনদের ভিড় জমে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির জন্য শ্রীলঙ্কা বিমানবাহিনী ড্রোন এবং একটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করে। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া সংঘর্ষের সময় কিছু বন্দি কারারক্ষীদের কাছ থেকে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছিল বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানোর সময় সাতজন কারারক্ষী নিহত হন। তাঁর ভাষ্য, সোমবার সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোতে বর্তমানে ৪১ হাজার ২৫০ জন বন্দি রয়েছেন, যা কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত বন্দি, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের প্রভাব কারাগার ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেগোম্বো কারাগারের এই ভয়াবহ সংঘর্ষ শুধু কারা নিরাপত্তার দুর্বলতাই নয়, বরং শ্রীলঙ্কার কারাগার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে কারা ব্যবস্থায় সংস্কার ও নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে এখন নজর থাকবে দেশটির নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর।





