ন্যাটো জোটে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান ইস্যুতে দীর্ঘদিনের মতবিরোধের জেরে স্পেনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগে তিনি স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ দেন এবং দেশটিকে ন্যাটোর ‘ভয়াবহ অংশীদার’ বলে আখ্যায়িত করেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, স্পেনের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা করার আগ্রহ নেই যুক্তরাষ্ট্রের। এরপর তিনি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে উদ্দেশ করে স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও স্পেন সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্পেনের দীর্ঘদিনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই উপকারী এবং সেই সম্পর্ক পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
মাদ্রিদ আরও স্পষ্ট করে জানায়, স্পেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হওয়ায় দেশটির বাণিজ্যনীতি এককভাবে নির্ধারিত হয় না। ইইউর অভিন্ন বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ফলে শুধুমাত্র স্পেনকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা আইনি ও বাস্তব উভয় দিক থেকেই জটিল হতে পারে।
এটি প্রথমবার নয় যে ট্রাম্প স্পেনকে বাণিজ্যিক চাপের মুখে ফেলতে চাইলেন। চলতি বছরের শুরুতেও তিনি একই ধরনের হুমকি দিয়েছিলেন। তখনও স্পেন একই অবস্থান নেয় এবং জানায়, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে পারে, কিন্তু শুধু স্পেনকে আলাদা করে লক্ষ্যবস্তু করা সহজ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও স্পেন সরকারের মধ্যে বিরোধের মূল সূত্রপাত ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে সদস্য দেশগুলোকে জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ন্যাটোর অধিকাংশ সদস্য এই প্রস্তাবে সম্মত হলেও স্পেন একমাত্র দেশ হিসেবে তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর থেকেই ট্রাম্প বারবার স্পেনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন।
দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ইরান সংকটকে কেন্দ্র করেও। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। পাশাপাশি স্পেন তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে অভিযান পরিচালনার অনুমতিও দেয়নি। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মাদ্রিদের কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।
ন্যাটো সম্মেলনের আগে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "স্পেন ন্যাটো জোটের ভয়াবহ অংশীদার। তারা কোনো কিছুতে অংশ নেয় না, পর্যাপ্ত অর্থও দেয় না। স্পেনের সঙ্গে আমি কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। সব ধরনের বাণিজ্য ও সফর বন্ধ করুন। এরপর দেখা যাবে তারা আবার বাণিজ্যের জন্য কীভাবে অনুরোধ করে।"
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নির্দেশ বাস্তবে কার্যকর করতে গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামো, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে ঘোষণাটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।










