রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ গত ২ জুলাই এক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ন্যাটোভুক্ত দেশ ফিনল্যান্ড পারমাণবিক অস্ত্র আমদানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায় দেশটি এখন রাশিয়ার সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে মেদভেদেভ ফিনল্যান্ডের এই সিদ্ধান্তকে ব্যঙ্গ করে লেখেন, “ফিনল্যান্ড পারমাণবিক অস্ত্র রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এতে ফিনিশদের জন্য কী পরিবর্তন আসবে? শুধু সামান্য একটি পরিবর্তন, আর তা হলো- দেশটি এখন রাশিয়ার পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে। আনন্দ করুন, ফিনল্যান্ড, আপনারা নিরাপত্তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছেন!” ।
এই ঘটনার পটভূমি হলো, গত ১৭ জুন ফিনল্যান্ডের পার্লামেন্ট সরকার প্রস্তাবিত একটি বিল অনুমোদন করে, যা দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে । ১৯৮৭ সালের পারমাণবিক শক্তি আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে ফিনল্যান্ডে পারমাণবিক অস্ত্রের আমদানি, ট্রানজিট, সরবরাহ এবং জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে তা মজুত করার দীর্ঘদিনের আইনি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় । সংশোধনীটি ২৬ জুন রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করার পর ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয় । ফিনল্যান্ড সরকার এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলে যে, ২০২৩ সালে ন্যাটোতে যোগদানের পর দেশটির প্রতিরক্ষা নীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে এবং ন্যাটো জোটের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানোর জন্য এই আইনি সংস্কার প্রয়োজনীয় ছিল । তবে ফিনল্যান্ড সরকার স্পষ্ট করেছে যে এই আইন কার্যকর হলেও দেশটিতে অবিলম্বে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করার পরিকল্পনা নেই এবং শান্তিকালে স্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হবে না বলেও আইনে উল্লেখ রয়েছে ।
মেদভেদেভের এই মন্তব্যের আগে থেকেই ফিনল্যান্ডের এই আইনি পরিবর্তন নিয়ে রাশিয়া বারবার উদ্বেগ ও কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল । গত এপ্রিলে রাশিয়ার হেলসিঙ্কি রাষ্ট্রদূত পাভেল কুজনেতসভ ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ফিনল্যান্ডের ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাব্য উপস্থিতি, এমনকি তা তাত্ত্বিক হলেও, রাশিয়ার পারমাণবিক পরিকল্পনায় পুরোপুরি বিবেচনায় নেওয়া হবে । রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভাও জানিয়েছেন, ফিনল্যান্ডের এই সিদ্ধান্তের জবাবে মস্কো রাজনৈতিক ও সামরিক-প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে । জেনেভায় জাতিসংঘের কার্যালয়ে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি গেনাডি গাতিলভ সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ফিনল্যান্ড বা পোল্যান্ডে ন্যাটোর পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনকে রাশিয়া তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি হিসেবে গণ্য করবে এবং তা অনুযায়ী পাল্টা ব্যবস্থা নেবে ।
বিশ্লেষকদের মতে, ফিনল্যান্ডের এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় এবং ন্যাটো-রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করতে পারে । ফিনল্যান্ডের জনমতেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি দেখা গেছে। মার্চ মাসের এক জরিপে ৪৯ শতাংশ ফিনিশ নাগরিক তাদের দেশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের বিরোধিতা করলেও, সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৭০ শতাংশ ফিনিশ কোনো না কোনো ধরনের পারমাণবিক প্রতিরোধকে সমর্থন করে । ফিনল্যান্ডের এই পদক্ষেপ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ দেশটির সাথে রাশিয়ার প্রায় ১,৩৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা ইউরোপের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি । যদিও মেদভেদেভের এই মন্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন, তবুও রাশিয়ার পক্ষ থেকে ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোনো আসন্ন পারমাণবিক হামলার পরিকল্পনা বা সামরিক পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি ।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৭ জুন, যখন ফিনল্যান্ডের পার্লামেন্ট ১২৫-৬১ ভোটে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা ১৯৮৭ সালের পরমাণু শক্তি আইনের সংশোধনী পাস করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নিরপেক্ষতা নীতির সময় প্রণীত হয়েছিল এবং ফিনল্যান্ডের ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্রের আমদানি, উৎপাদন, মজুত ও বিস্ফোরণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছিল । নতুন আইনটি, যা ১লা জুলাই কার্যকর হয়, ফিনল্যান্ডকে ন্যাটো জোটের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মিত্রদের অস্ত্র আমদানি, পরিবহন বা নিজ ভূখণ্ডে মজুত করার অনুমতি দেয় । তবে ফিনল্যান্ড সরকার বার বার জোর দিয়ে বলেছে যে তাদের ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই ।
এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হিসেবে ফিনল্যান্ড ২০২৩ সালে ন্যাটোতে যোগদানের পর তার প্রতিরক্ষা নীতির আমূল পরিবর্তনকে উল্লেখ করছে । ফিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান হেইকি অট্টো এক সাক্ষাৎকারে এটাকে “রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন । ফিনিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্তি হাক্কানেন এই সিদ্ধান্তকে “ঐতিহাসিক সংস্কার” আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি “ফিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা এবং ন্যাটোর সম্পূর্ণ পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যবহারের” সুযোগ তৈরি করে । বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি হতে পারে সংকটকালীন সময়ে ফিনিশ বিমান ঘাঁটিতে মিত্র বাহিনীর দ্বৈত-সক্ষম বিমান (যুদ্ধ বিমান যা পারমাণবিক অস্ত্র বহন করতে পারে) অস্থায়ীভাবে মোতায়েন করা । এছাড়াও, ফিনল্যান্ড ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ-এর প্রস্তাবিত ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধ উদ্যোগে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে বিবেচনা করছে, যেখানে ফরাসি পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত বিমান ফিনল্যান্ডের ঘাঁটিতে অবস্থান করতে পারে ।
অবশ্য, ফিনল্যান্ডের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাশিয়া প্রথম থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছিল। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে “ফিনল্যান্ডের ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করলে তা রাশিয়ার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে এবং আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব” । রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের জবাবে মস্কো রাজনৈতিক ও সামরিক-প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে । জেনেভায় জাতিসংঘের কার্যালয়ে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি গেনাডি গাতিলভ আরও স্পষ্ট করে বলেন যে ফিনল্যান্ড বা পোল্যান্ডে ন্যাটোর পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনকে রাশিয়া তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য “প্রত্যক্ষ হুমকি” হিসেবে গণ্য করবে এবং তা অনুযায়ী পাল্টা ব্যবস্থা নেবে ।
এই উত্তেজনার প্রেক্ষিতে মেদভেদেভের বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা কেবল হুমকি হিসেবেই নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত বার্তা হিসেবেও দেখছেন। এর মাধ্যমে রাশিয়া ফিনল্যান্ড এবং অন্যান্য ন্যাটো দেশগুলিকে তাদের সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করছে । এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া ১লা জুলাই থেকে ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও লাটভিয়ার সাথে তার সাতটি রেল সীমান্ত ক্রসিং সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটিই ফিনল্যান্ড সীমান্তে । ২০২৩ সালের শেষের দিকে ফিনল্যান্ড নিজেও যাত্রী চলাচলের জন্য স্থল সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল । এখন কেবল বৈনিক্কালা রেলপথটি মালবাহী ট্র্যাফিকের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, যা ফিনল্যান্ড ও রাশিয়ার মধ্যে একমাত্র কার্যকরী রেল সংযোগ । এই পদক্ষেপটিকে পারমাণবিক বিরোধের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এটি ইঙ্গিত দেয় যে উত্তেজনা শুধু বাক্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ।
ফিনল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্ত বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে, সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৭০ শতাংশ ফিনিশ নাগরিক কোনো না কোনো ধরনের পারমাণবিক প্রতিরোধকে সমর্থন করে । অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপ আন্দোলনের কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে এই সিদ্ধান্ত ফিনল্যান্ডকে “একটি স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে” পরিণত করতে পারে এবং রাশিয়ার সাথে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে । স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক টাইট্টি এরাস্টো মনে করেন, মস্কো এটাকে “ন্যাটো যে প্রকৃতপক্ষে তার পারমাণবিক অস্ত্রের প্রস্তুতি বাড়ানোর জন্য অপারেশনাল পরিকল্পনা করছে” তার একটি কংক্রিট সংকেত হিসেবে দেখতে পারে । হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেইকি পাতোমাকি এই দ্বন্দ্বের সারমর্ম তুলে ধরেছেন: “যখন সামরিক বাহিনী ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়, তখন নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি এবং সহিংস সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়” ।



