ডায়াবেটিস মেলিটাস বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জনস্বাস্থ্য। ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১৫ কোটি, যা ২০১০ সালের মধ্যে ২২ কোটিতে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা আরও ভয়াবহ—২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) ১১তম ডায়াবেটিস অ্যাটলাস অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ২০-৭৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৮ কোটি ৯০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, অর্থাৎ প্রতি নয়জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ৮৩ কোটিরও বেশি—এই পার্থক্য মূলত ডায়াগনোসিসের বিভিন্ন মানদণ্ড ব্যবহারের কারণে।
বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রকোপ ১৯৯০ সালে ৭% থেকে ২০২২ সালে ১৪%-এ উন্নীত হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২২ সালে ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী ডায়াবেটিস রোগীদের ৫৯% তাদের রোগের জন্য কোনো ঔষধ গ্রহণ করছিলেন না। আইডিএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি আটজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবেন—যার সংখ্যা হবে প্রায় ৮৫ কোটি ৩০ লাখ।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যার মধ্যে ২ কোটি ৯৭ লাখের রোগ নির্ণয় করা হয়েছে এবং ৮৭ লাখ মানুষ unaware যে তারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন।
ডায়াবেটিস মূলত অগ্ন্যাশয়ের বিটা-কোষ পর্যাপ্ত ইনসুলিন নিঃসরণ করতে না পারার ফলে হয়। টাইপ ১ ডায়াবেটিস একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিটা-কোষকে ধ্বংস করে। এইচএলএ হ্যাপ্লোটাইপের সাথে এর শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ইনসুলিন প্রতিরোধই মূল বিপাকীয় অস্বাভাবিকতা। রোগের স্বাভাবিক ইতিহাস স্থূল থেকে স্বাভাবিক গ্লুকোজ সহনশীলতার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ইনসুলিন সংবেদনশীলতা হ্রাস পায়। এরপর প্রতিবন্ধী গ্লুকোজ সহনশীলতায় (আইজিটি) অগ্রসর হলে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা আরও হ্রাস পায় এবং ইনসুলিন নিঃসরণে আপেক্ষিক ঘাটতি দেখা দেয়। আইজিটি থেকে ডায়াবেটিসে অগ্রসর হলে ইনসুলিন নিঃসরণ কমতে থাকে, যদিও ইনসুলিন সংবেদনশীলতার আরও অবনতি ঘটে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, আইজিটির উন্নত পর্যায়ে ৮০% ইনসুলিন নিঃসরণ ক্ষমতা হারিয়ে যায়। একটি অটোপসি গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাসের গ্লুকোজ বৃদ্ধির সময় বিটা-কোষের ভর ৫০% কমে যায়। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সাথে জড়িত জিনগুলোর মধ্যে KCNJ11 (যা অগ্ন্যাশয়ের এটিপি-সংবেদনশীল পটাসিয়াম চ্যানেল Kir6.2 এনকোড করে) এবং TCF7L2 (যা প্রোগ্লুকাগন জিন প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১ বা জিএলপি-১ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে) উল্লেখযোগ্য। TCF7L2 জিনের অস্বাভাবিক বাহকদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৬০% বেশি।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে জিএলপি-১-এর ঘাটতি এবং গ্লুকোজ-নির্ভর ইনসুলিনোট্রপিক পলিপেপটাইডের (জিআইপি) প্রতি প্রতিরোধও দেখা যায়। প্লাজমা ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড বৃদ্ধির কারণে লাইপোটক্সিসিটি ইনসুলিন নিঃসরণ ব্যাহত করে। অধিকন্তু, গ্লুকোটক্সিসিটি—বর্ধিত গ্লুকোজ মাত্রা ইনসুলিন নিঃসরণকে ব্যাহত করে। অ্যামাইলয়েড পলিপেপটাইড জমাও বিটা-কোষের ব্যর্থতার কারণ।
ডায়াবেটিসের মানবিক বোঝা এর ভয়াবহ দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার ফল। ডায়াবেটিস যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্কদের নতুন অন্ধত্বের প্রধান কারণ—প্রতি বছর ২৪,০০০ মানুষ ডায়াবেটিসের কারণে আইনত অন্ধ হন। ডায়াবেটিস এখন ডায়ালিসিস বা প্রতিস্থাপনের ৪৩% রোগীর জন্য দায়ী, যা এন্ড-স্টেজ রেনাল ডিজিজের প্রধান কারণ। ডায়াবেটিস রোগীদের অ-ডায়াবেটিক জনগোষ্ঠীর তুলনায় হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা ২-৬ গুণ বেশি এবং স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা ২-৪ গুণ বেশি। ডায়াবেটিস অ-আঘাতজনিত নিম্ন অঙ্গচ্ছেদের প্রধান কারণ, যা মোট অঙ্গচ্ছেদের ৬০% জন্য দায়ী। প্রতি বছর আনুমানিক ৮২,০০০ অঙ্গচ্ছেদ ডায়াবেটিসের কারণে হয়।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিস রোগীদের হৃদরোগ বা স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা অ-ডায়াবেটিকদের তুলনায় দ্বিগুণ। প্রায় প্রতি তিনজনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর ক্রনিক কিডনি ডিজিজ রয়েছে। স্নায়ুর ক্ষতি (নিউরোপ্যাথি) একটি সাধারণ জটিলতা যা অসাড়তা এবং ব্যথার কারণ হতে পারে।
তবে আশার কথা হলো, গত ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ডায়াবেটিসের জটিলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হ্রাস observed। এলোমেলোভাবে নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে সতর্ক গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণ, আক্রমনাত্মক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, এলডিএল কোলেস্টেরল হ্রাস এবং অ্যাসপিরিন থেরাপি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।
ইনক্রিটিন হলো ক্ষুদ্রান্ত্রের অন্তঃক্ষরা কোষ থেকে নিঃসৃত হরমোন, যা খাওয়ার পর রক্তে নির্গত হয়। দুটি প্রধান ইনক্রিটিন হলো গ্লুকোজ-নির্ভর ইনসুলিনোট্রপিক পলিপেপটাইড (জিআইপি) এবং গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১ (জিএলপি-১)। উভয় ইনক্রিটিন ডাইপেপটিডিল পেপটিডেজ-৪ (ডিপিপি-৪) এনজাইম দ্বারা দ্রুত নিষ্ক্রিয় হয়।
২০০৫ সাল থেকে ইনক্রিটিন-ভিত্তিক দুটি নতুন শ্রেণীর ঔষধ টাইপ ২ ডায়াবেটিসের জন্য অনুমোদিত হয়েছে:
১. ইনক্রিটিন মিমেটিক (জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট): যেমন এক্সেনাটাইড, যা সাবকিউটেনিয়াস ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়। এটি রক্তের গ্লুকোজ কমায় এবং ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ায়। এর ইনসুলিন নিঃসরণ ক্ষমতা গ্লুকোজ-নির্ভর, তাই হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা কম।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ডাব্লিউএইচও তাদের প্রয়োজনীয় ঔষধের তালিকায় জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (সেমাগ্লুটাইড, ডুলাগ্লুটাইড এবং লিরাগ্লুটাইড) এবং জিআইপি/জিএলপি-১ (টিরজেপাটাইড) অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই ঔষধগুলো রক্তের গ্লুকোজ কমায়, কার্ডিওভাসকুলার ঘটনা হ্রাস করে, মৃত্যুঝুঁকি কমায় এবং ওজন হ্রাসে সাহায্য করে। এগুলি টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যারা কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, কিডনি ডিজিজ বা স্থূলতায় (বিএমআই ≥ ৩০ কেজি/মি²) ভোগেন।
২. ইনক্রিটিন এনহ্যান্সার (ডিপিপি-৪ ইনহিবিটর): যেমন সিটাগ্লিপটিন, যা মৌখিকভাবে সক্রিয় এবং অন্তঃসত্ত্বা ইনক্রিটিনের মাত্রা বৃদ্ধি করে।
এসজিএলটি-২ ইনহিবিটরের চিকিৎসায় নতুন মাত্রা
২০২৫ সালে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে এসজিএলটি-২ ইনহিবিটরদের নিয়ে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্স (নাইস) তাদের খসড়া নির্দেশিকায় এসজিএলটি-২ ইনহিবিটরদের দ্বিতীয়-সারির চিকিৎসা থেকে প্রথম-সারির চিকিৎসায় উন্নীত করেছে। যেসব রোগী মেটফর্মিন (ঐতিহ্যবাহী প্রথম ডায়াবেটিস ঔষধ) সহ্য করতে পারেন না, তাদের জন্য এসজিএলটি-২ ইনহিবিটর দিয়ে শুরু করার সুপারিশ করা হয়েছে। কারণ প্রমাণ দেখায় যে এই ঔষধগুলো শুধু রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের বাইরেও হৃদয় ও বৃক্ককে সুরক্ষা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসজিএলটি-২ ইনহিবিটরের ব্যবহার ৯০%-এ পৌঁছালে প্রায় ২২,০০০ প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
বিএমজে র্যাপিড রিকমেন্ডেশনস সিরিজের অংশ হিসেবে প্রকাশিত একটি নতুন লিভিং ক্লিনিকাল প্র্যাকটিস গাইডলাইন কার্ডিওভাসকুলার এবং রেনাল ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসার সুপারিশ করে। কম ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য এসজিএলটি-২ বা জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্টের বিরুদ্ধে দুর্বল সুপারিশ করা হয়েছে। মাঝারি ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জন্য এই ঔষধগুলোর পক্ষে দুর্বল সুপারিশ করা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জন্য এসজিএলটি-২ বা জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্টের পক্ষে শক্তিশালী সুপারিশ রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ সালের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের থিম নির্ধারণ করেছে "সারা জীবনের পর্যায়ে ডায়াবেটিস", যা শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও যত্নের সমন্বিত পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব—স্বাস্থ্যকর খাদ্য, শারীরিক কার্যকলাপ, রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, তামাক এড়ানো এবং চিনি গ্রহণ কমানোর মাধ্যমে। ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদের মতে, শারীরিক কার্যকলাপ, সুষম খাদ্য এবং সচেতনতার মাধ্যমে প্রায় ৬৫% ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, কম-ক্যালোরি ডায়েটের মাধ্যমে ওজন হ্রাস এবং ওজন ব্যবস্থাপনা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষমা (রেমিশন) অর্জন করতে পারে। সাম্প্রতিক এলোমেলোভাবে নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালগুলো প্রমাণ করেছে যে নিবিড় জীবনযাপন পরিবর্তনের মাধ্যমে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষমা অর্জন সম্ভব।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিসের দিক থেকে বিশ্বের অষ্টম স্থানে রয়েছে। আইডিএফের ২০২৫ সালের অ্যাটলাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১১.১% প্রাপ্তবয়স্ক (প্রতি নয়জনের একজন) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আইডিএফের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৩.২% মানুষ (প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবে স্থানীয় চিকিৎসকরা মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেকেই অজ্ঞাত remain। আরও উদ্বেগের বিষয়, ৪০%-এর বেশি।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে দুইজন ডায়াবেটিক বা প্রি-ডায়াবেটিক। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১৫-৩৫ বছর বয়সী প্রতি ১০০ জন তরুণের মধ্যে ৭.৪ জনের ডায়াবেটিস রয়েছে, যেখানে মহিলাদের মধ্যে প্রকোপ (৭.৮%) পুরুষদের (৬.৯%) তুলনায় বেশি।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের এই ভয়াবহ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে আসীন অফিস জীবনযাপন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ এবং অপর্যাপ্ত বিশ্রাম। বাংলাদেশের নগর কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর ২০-২৫% ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিসে ভোগেন। তবে অনেক কর্মী কলঙ্ক বা চাকরি হারানোর ভয়ে নিজেদের অবস্থা গোপন রাখেন।
বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপ সুপারিশ করেছেন:
· কর্মদিবসে কমপক্ষে এক ঘণ্টা শারীরিক কার্যকলাপ নিশ্চিত করা
· স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা করা
· কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
· নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা
· নির্ধারিত বিরতি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা
ডায়াবেটিস বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল বোঝা। ডায়াবেটিস সম্পর্কিত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যয় বার্ষিক $৯৬৬ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। আইডিএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে ডায়াবেটিস সম্পর্কিত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যয় ১.০৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। যুক্তরাষ্ট্রে ডায়াবেটিসের অর্থনৈতিক বোঝা সবচেয়ে বেশি (২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার), তারপরে ভারত (১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং চীন (১.০ ট্রিলিয়ন ডলার)।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০-৬০% ডায়াবেটিস রোগী আর্থিক বিষাক্ততার (ফাইন্যান্সিয়াল টক্সিসিটি) সম্মুখীন হন, যেখানে রোগ ব্যবস্থাপনায় পরিবারের ব্যয় আয়ের ৫-৪০% পর্যন্ত হতে পারে। গত ১৭ বছরে ডায়াবেটিসজনিত স্বাস্থ্য ব্যয় ৩৩৮% বৃদ্ধি পেয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ডায়াবেটিস একটি বৈশ্বিক মহামারি যা দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ২০২৫ সালেই বিশ্বে প্রায় ৫৯ কোটির বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত, এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৮৫ কোটিতে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। চিকিৎসায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও—জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্ট এবং এসজিএলটি-২ ইনহিবিটরদের মতো অত্যাধুনিক ঔষধের আবির্ভাব—বেশিরভাগ রোগীই পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকট আরও গুরুতর। প্রতি তিনজনের মধ্যে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিক বা প্রি-ডায়াবেটিক, অথচ ৪০%-এর বেশি unaware। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন:
১. ব্যাপক সচেতনতা অভিযান—বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে এবং গ্রামীণ এলাকায়
২. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে উৎসাহ—সাদা চালের পরিবর্তে আঁশযুক্ত খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম
৩. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—বিশেষ করে ৩০ বছর উর্ধ্বে ব্যক্তির জন্য
৪. সাশ্রয়ী মূল্যে অত্যাধুনিক ঔষধের প্রাপ্যতা—বিশেষ করে জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্ট এবং এসজিএলটি-২ ইনহিবিটর
৫. কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য-বান্ধব পরিবেশ—ব্যায়ামের সুযোগ, স্বাস্থ্যকর খাবার, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা
ডায়াবেটিসের সঙ্গে লড়াই কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের লড়াই নয়—এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক লড়াই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাঁচটি বৈশ্বিক ডায়াবেটিস লক্ষ্যমাত্রা—৮০% রোগী নির্ণয়, ৮০% রোগীর গ্লাইসেমিয়া নিয়ন্ত্রণ, ৮০% রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ—অর্জন করতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সময় এখনই, পদক্ষেপ এখনই।