জুলাই সনদ, গণভোট এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দিনাজপুরের হিলি পৌর শহরের খাদ্যগুদাম মোড়ে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই গড়তে পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা সর্বপ্রথম ভেঙেছে বিএনপি। তাঁর ভাষায়, জুলাই আন্দোলনের আদর্শ, চেতনা ও শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে যদি কেউ প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে, তবে সেটিও বিএনপি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বিএনপি যদি তাদের অবস্থান সংশোধন করে, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও জুলাইয়ের ঐক্য পুনর্গঠন সম্ভব। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যেমন ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রাম চলেছে, একই ধরনের রাজনৈতিক আচরণ বিএনপি অব্যাহত রাখলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
এনসিপির এই কর্মসূচিতে উপস্থিত দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমও ভারতের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করে না, সীমান্ত ও মানবাধিকার প্রশ্নে দায়িত্বশীল আচরণ করে না এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থবিরোধী ভূমিকা নেয়, তাদের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
এদিকে এনসিপির অভিযোগের জবাবে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই সনদকে ঘিরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ বিষয়ে দলের অবস্থান সুস্পষ্ট।
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মরণসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, জুলাই সনদের প্রতিটি বিষয় বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপি ইতোমধ্যেই অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যে দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেবে, সেই দল তার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী এসব বাস্তবায়ন করবে সনদেও এমন নীতির কথাই উল্লেখ রয়েছে।
তিনি বলেন, উচ্চকক্ষ গঠন কিংবা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থার মতো কিছু বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে আগে কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে এসব বিষয়ে দলটি কখনোই একমত ছিল না। তাঁর অভিযোগ, জনগণের পূর্ণ সম্মতি ছাড়া কিছু বিষয় যুক্ত করে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সংবিধান প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দলটি বরাবরই সংবিধান সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, কিন্তু সংবিধান পুনর্লিখন বা সম্পূর্ণ সংস্কারের পক্ষে নয়। তাঁর ভাষায়, জনগণ বিএনপিকে যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, সেটির ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিএনপির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কারের পেছনে বিএনপিরই নেতৃত্ব ছিল। তিনি দাবি করেন, এসব ঐতিহাসিক ভূমিকা উপেক্ষা করে দলটির বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির লাখো নেতাকর্মী মামলা, গুম, নির্যাতন ও প্রাণহানির শিকার হয়েছেন। তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলন কোনো এক মাসের আন্দোলন নয়; বরং প্রায় দুই দশক ধরে চলা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিক পরিণতি।
স্মরণসভায় বক্তব্যের একপর্যায়ে মির্জা ফখরুল জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে ধৈর্য, সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ, গণভোট, সাংবিধানিক সংস্কার এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্যতম প্রধান বিতর্কে পরিণত হতে পারে। এনসিপি ও বিএনপির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই রাজনৈতিক দূরত্বকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।











