জুলাই পদযাত্রার কর্মসূচিকে সামনে রেখে সাংগঠনিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এবার দলটি উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল—এই দুই ভাগে বিভক্ত করে দেশের ৫৮টি জেলা এবং প্রায় ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় কর্মসূচি পরিচালনা করছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণ সীমিত রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃত্বকে সামনে আনার মাধ্যমে তৃণমূল সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়েছে দলটি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবারের পদযাত্রায় জাতীয়ভাবে পরিচিত নারী নেত্রীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি হলেও এনসিপির নেতারা বলছেন, এটি কোনো নীতিগত পরিবর্তন নয়; বরং তৃণমূল পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার অংশ হিসেবে স্থানীয় নেতাদের বেশি দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারী ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এনসিপির রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই আন্দোলনের পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। একই বছরের জুলাইয়ে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশব্যাপী সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে দলটি। এক বছর পর আবারও একই কর্মসূচি শুরু হলেও এবার তার পরিচালন কৌশলে এসেছে পরিবর্তন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, এবারের পদযাত্রায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যে অঞ্চলের দায়িত্বে যে নারী নেত্রী রয়েছেন, মূলত তিনিই সেই এলাকার কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করাই দলের লক্ষ্য।
নারী নেতৃত্ব বিকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে প্রথমে সামাজিক নেতৃত্বে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পরে সেই নেতৃত্বকে রাজনীতির মূলধারায় নিয়ে আসতে রাজনৈতিক দলগুলোকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁর মতে, তৃণমূল থেকেই নারী নেতৃত্ব তৈরি করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তবে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ভিন্ন একটি দিকও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, দলের নিজস্ব অবস্থানে নারী নেতৃত্ব নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটে থাকার কারণে নারী অধিকার ও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের প্রশ্নে বিভিন্ন দলের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। তাঁর মতে, জোটের অন্য অনেক দল এখনো নারী নেতৃত্বের বিষয়ে এনসিপির মতো সুস্পষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি এবং সেই বাস্তবতার কিছু প্রভাব দলীয় কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
সামান্তা শারমিন আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের জন্য এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা এবং নানা ধরনের সামাজিক চাপের কারণে অনেক নারী রাজনীতিতে আসতে নিরুৎসাহিত হন। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বিশেষ নীতিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম জানিয়েছেন, এবারের জুলাই পদযাত্রার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে তৃণমূল সংগঠনকে আরও সুসংগঠিত করা। তিনি বলেন, উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল—দুই ভাগে কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিটি টিমে কেন্দ্রীয় নেতাদের সংখ্যা সীমিত রাখা হয়েছে। এর পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব ও অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে তৃণমূল সংগঠন বিস্তারের কৌশল হিসেবে এই পরিবর্তন এনসিপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনার মাধ্যমে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে দলের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছে দলটি।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপি সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটে যোগ দেয়। এরপর দলটির কয়েকজন নেতা দল ছেড়ে যান এবং কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও তৃণমূল নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার উদ্যোগকে এনসিপির নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।











