জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি, সংক্ষেপে এএফডি, তাদের বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়েছে। শনিবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর এরফুর্টে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনের বিরুদ্ধে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান। শ্রমিক ইউনিয়ন, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর আহ্বানে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। Reuters জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করে সম্মেলনকেন্দ্রে যাওয়া কঠিন করে তোলেন, আর AP ও Guardian উভয়েই কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেছে।
সম্মেলনে এএফডির সহ-নেতা অ্যালিস ভাইডেল এবং টিনো ক্রুপালা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হন। দলের ভেতরে তাদের নেতৃত্বকে এখন জার্মান রাজনীতিতে আরও বড় প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক জনমত জরিপে এএফডি জাতীয়ভাবে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত সমর্থন পেয়েছে, যা চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের CDU/CSU জোটকে কিছু জরিপে ছাড়িয়ে গেছে।
দলটির সম্মেলনে অভিবাসনবিরোধী বার্তাও স্পষ্টভাবে উঠে আসে। Reuters জানায়, এএফডির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “Send them back” শিরোনামের গান প্রচার করা হয় এবং সম্মেলনস্থলে এমন পোস্টকার্ডও বিক্রি হয়, যাতে “You will be deported” লেখা ছিল। দলটি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কঠোর অবস্থান নিয়ে রাজনীতিতে এগিয়ে চলেছে।
সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ভাইডেল বলেন, দেশকে “রক্ষা” করার এটিই শেষ সুযোগ। তিনি জার্মানির “অধঃপতন” ঠেকাতে এবং জাতীয় পরিচয় রক্ষায় আরও বেশি মানুষকে এএফডির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান বলে Reuters উল্লেখ করেছে। একই সুরে এএফডির অন্যতম বিতর্কিত নেতা বিয়র্ন হ্যোকে জার্মানিকে একটি “মহান” দেশ হিসেবে তুলে ধরার দাবি জানান এবং নিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধারের কথা বলেন।
বিক্ষোভকারীদের চোখে এএফডি শুধু একটি কট্টর ডানপন্থী দল নয়, বরং জার্মান গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় হুমকি। Guardian-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবাদকারীরা মূল সড়ক, ট্রাম লাইন এবং সম্মেলনস্থলের প্রবেশপথ অবরোধ করার চেষ্টা করেন। কিছু বিক্ষোভকারী ট্রাম লাইনে বসে পড়েন, কেউ কেউ সেতু থেকে ঝুলে থাকা ব্যানার নামিয়ে দেন, আবার কেউ পুলিশ ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন। পুলিশ পরিস্থিতিকে মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ বললেও শতাধিক ছোটখাটো অপরাধের খবর পাওয়া যায়।
এএফডির উত্থান জার্মানির রাজনৈতিক কাঠামোয় নতুন চাপ তৈরি করেছে। Reuters-এর ফেব্রুয়ারির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জার্মানির একটি আদালত গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া “extremist” লেবেল সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয়, তবে সেটি দলটির বিরুদ্ধে সন্দেহ পুরোপুরি দূর করেনি। ওই সময় আদালত বলেছিল, কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকারবিরোধী অবস্থানের শক্ত সন্দেহ থাকলেও পুরো দলকে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ তখন ছিল না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এএফডির সমর্থন বিশেষভাবে সাবেক পূর্ব জার্মানির রাজ্যগুলোতে বেশি শক্তিশালী, যেখানে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, অভিবাসন-ভয় এবং মূলধারার দলগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা দীর্ঘদিন ধরে ভোটারদের মধ্যে জমে আছে। Reuters বলছে, দলটি আগামী সেপ্টেম্বরের আঞ্চলিক নির্বাচনে বড় সাফল্যের লক্ষ্য নিয়েছে, বিশেষ করে সাকসেন-আনহাল্ট এবং মেকলেনবুর্গ-ফোরপমার্নে। সেখানে ভালো ফল পেলে দলটি জাতীয় রাজনীতিতেও আরও শক্তিশালী দরকষাকষির অবস্থানে যেতে পারে।
জার্মানির মূলধারার দলগুলো এখনো এএফডির সঙ্গে জোট গঠনের ব্যাপারে কড়া “ফায়ারওয়াল” বজায় রেখেছে। অর্থাৎ, নির্বাচনে শক্ত অবস্থান পেলেও দলটিকে সরকারে না নেওয়ার নীতিই আপাতত জার্মান রাজনীতির প্রধান কৌশল। কিন্তু জরিপে তাদের উত্থান এই নীতিকে ক্রমেই আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। Reuters-এর ভাষ্যে, দেশটির অনেক ভোটারই অভিবাসন, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা নিয়ে ক্ষুব্ধ, আর এএফডি সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।
সম্মেলনস্থলের বাইরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল যাতে বিক্ষোভ ও সম্ভাব্য সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। Guardian জানিয়েছে, এএফডি সম্মেলনের সময় এবং স্থানও সমালোচনার মুখে পড়ে, কারণ এটি নাৎসি পার্টির একটি শতবর্ষ-সংক্রান্ত রাজনৈতিক স্মৃতির কাছাকাছি সময়ে ও অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয় বলে বিরোধীরা এটিকে উসকানিমূলক বলে দেখছে। দলটির বিরুদ্ধে বর্ণবাদ, অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দুর্বল করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
সব মিলিয়ে এরফুর্টের এই সম্মেলন জার্মান রাজনীতিতে এএফডির ক্রমবর্ধমান প্রভাব, এর বিরুদ্ধে জনরোষ এবং ভবিষ্যতে ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতির দিক কোন দিকে যাচ্ছে—তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। দলটি নিজেদের ক্ষমতার কাছাকাছি বলে দাবি করলেও, রাস্তার প্রতিরোধ দেখিয়েছে যে জার্মান সমাজের বড় একটি অংশ এখনো এএফডির রাজনীতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।





