রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের দীর্ঘদিনের যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করে গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ভয়াবহ এক হামলা চালিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের 'বড় ধরনের হামলার' সতর্কবার্তা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কিয়েভে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোনের সম্মিলিত আক্রমণ চালায় রুশ বাহিনী । এই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৮৬ জন ।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বুধবার আয়ারল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে কিয়েভবাসীকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান । তিনি লেখেন, "আমরা জানি, পুতিন কিছুদিন ধরেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আজ রাতের সবচেয়ে বড় হুমকি সেটিই" । তার এই সতর্কবার্তার সঙ্গেই কিয়েভের বাসিন্দারা মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিতে শুরু করেন এবং একটি দীর্ঘ ও ভয়াবহ রাতের জন্য প্রস্তুতি নেন ।
স্থানীয় সময় বুধবার রাত ৮টার দিকে কিয়েভে বিমান হামলার সাইরেন বাজতে শুরু করে এবং তা টানা ১১ ঘণ্টা ধরে বাজতে থাকে । ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, এই হামলায় রাশিয়া মোট ৭৪টি মিসাইল এবং ৪৯৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে । এর মধ্যে ইউক্রেনীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৪৮টি মিসাইল ও ৪৭৬টি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে । তবে ব্যালিস্টিক মিসাইলের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল এবং সেগুলো আটকানোর হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের বিমান বাহিনী ।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, এই হামলায় শহরের সাতটি জেলায় আবাসিক এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । সরাসরি হামলায় একটি ৯ তলা আবাসিক ভবনের ছয় তলা পর্যন্ত ধসে পড়ে এবং বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন । উদ্ধারকারীরা সারারাত ধরে ধ্বংসস্তূপ থেকে নিহত ও আহতদের উদ্ধারের কাজ চালান । কিয়েভ সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো জানিয়েছেন, শহরের প্রায় ৩০টি স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে আবাসিক ভবন, একটি বাজার, একটি হোটেল এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স সাবস্টেশন রয়েছে । অ্যাম্বুলেন্স সাবস্টেশনে হামলার কারণে বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী আহত হয়েছেন । কিয়েভের বাসিন্দারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগুনে পুড়ে যাওয়া অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক এবং ধ্বংসস্তূপের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেছেন ।
এই হামলায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা । কিয়েভের মেয়র শুক্রবার শহরে শোক দিবস ঘোষণা করেছেন । ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিলহা এই হামলাকে 'সন্ত্রাস' আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ দাবি করেছেন । তিনি বলেছেন, "রাশিয়া বেসামরিক ভবন ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এটি গুরুতর যুদ্ধাপরাধ এবং আমরা সব অংশীদার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এ বিষয়ে জানাচ্ছি" । ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস বলেছেন, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা এবং রাশিয়ার ওপর চাপ বৃদ্ধি না করলে এই হামলা বন্ধ করা সম্ভব নয় ।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য তাদের দাবিতে জানিয়েছে, তারা কিয়েভসহ দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, পোলতাভা, চেরকাসি ও চেরনিহিভ অঞ্চলের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে নির্ভুল ও দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে এই হামলা চালিয়েছে । মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার জবাবে তারা এই আক্রমণ চালিয়েছে ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেনের অভ্যন্তরে তেল শোধনাগার, তেল টার্মিনাল, অস্ত্র কারখানা ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রের মতো কৌশলগত স্থাপনায় ব্যাপক ড্রোন হামলা চালানোর জবাব দিতেই রাশিয়া এই ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে । সম্প্রতি ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে এবং ক্রিমিয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছে । ইউক্রেন জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার ভূখণ্ডে অবস্থিত বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর অধিকার রাখে এবং এই হামলার লক্ষ্য পুতিনকে যুদ্ধ শেষে আলোচনায় আসতে বাধ্য করা । এর আগে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ সেনাদের ৯০ শতাংশের বেশি হতাহতের কারণ ড্রোন হামলা , যা এই যুদ্ধে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে নির্দেশ করে ।





