চীনের সাংহাইয়ে শুরু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক আয়োজন ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কনফারেন্স (WAIC) ২০২৬, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও উদ্ভাবকদের পাশাপাশি অংশ নিয়েছে বাংলাদেশও। চার দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নকে কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে না রেখে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট গভর্ন্যান্স, এআইভিত্তিক উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের অগ্রগতি তুলে ধরবেন। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা, বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা করবেন।
উদ্বোধনী ভাষণে শি জিনপিং বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ এমন হতে হবে যেখানে মানুষই থাকবে কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই যেন সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বৈশ্বিক আইনগত কাঠামো, প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবস্থা এবং দ্রুত জরুরি প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা। তাঁর মতে, এআইয়ের বিকাশ হবে নিরাপদ, দায়িত্বশীল এবং মানবকল্যাণমুখী।
চীনা প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন কোনো একক দেশের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হতে পারে না। বরং এটি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আস্থা এবং যৌথ উদ্ভাবনের একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। তিনি জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সীমিত করার প্রবণতারও সমালোচনা করেন এবং বলেন, একটি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্য দেশের উন্নয়ন বা নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়।
বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি সামরিক ব্যবহার, সাইবার অপরাধ, তথ্য নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই বাস্তবতায় শি জিনপিং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সমান প্রযুক্তিগত সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি জানান, আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ব্রিকসভুক্ত দেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে এআই সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায় চীন, যাতে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত বৈষম্যের নতুন কোনো বিভাজন তৈরি না হয়।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে "AI Partnership for a Shared Future" বা "উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য এআই অংশীদারিত্ব"। আয়োজকদের মতে, এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে একদিকে যেমন শিল্প, অর্থনীতি ও সমাজে এআইয়ের ইতিবাচক ভূমিকার কথা তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক এআই সুশাসনের জন্য সব দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।
সাংহাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রদর্শনীর আয়তনের দিক থেকে এবারই সবচেয়ে বড় আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এক লাখ বর্গমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে ১,১০০-এর বেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। প্রদর্শিত হচ্ছে ৩,০০০-এরও বেশি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, যার মধ্যে ৩০০টিরও বেশি নতুন এআই পণ্য প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করা হচ্ছে।
শাংহাইয়ের উপ-মেয়র ছেন চিয়া বলেন, গত আট বছর ধরে সফলভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে শহরটি। বর্তমানে এটি শুধু চীনের নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এআই উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, বুদ্ধিমান কম্পিউটিং, এমবডিড এআই, রোবটিক্স, উন্নত চিপ প্রযুক্তি এবং শিল্পখাতে এআই ব্যবহারের সর্বাধুনিক উদ্ভাবনগুলো এবার একসঙ্গে প্রদর্শিত হচ্ছে।
চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের বাজারমূল্য ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে যাবে। একই সঙ্গে মানবসদৃশ রোবটের বার্ষিক উৎপাদন এক লাখ ইউনিট অতিক্রম করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে চীনের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ৩০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
চীনের ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশনের (NDRC) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার বড় পরিসরে কাজ করছে। গত বছরের নীতিমালার ধারাবাহিকতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, শিল্প ও প্রশাসনে এআই ব্যবহারের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।
সম্মেলনে চীনের বিভিন্ন স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও নিজেদের নতুন উদ্ভাবন তুলে ধরছে। এর মধ্যে স্থানীয় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তংফাং সুয়ানসিন জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিকে তারা এমন নতুন প্রজন্মের এআই চিপ বাজারে আনবে, যার কার্যক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানের উন্নত চিপগুলোর সমপর্যায়ে পৌঁছাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন মাত্রা পাচ্ছে, তখন WAIC ২০২৬ শুধু একটি প্রযুক্তি প্রদর্শনী নয়; বরং বৈশ্বিক এআই নীতিমালা, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ দেশের ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।