# আলিবাবার ক্লড কোড নিষেধাজ্ঞা: প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা থেকে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবaba সম্প্রতি তাদের কর্মীদের জন্য অ্যানথ্রোপিকের (Anthropic) এআই কোডিং সহকারী 'ক্লড কোড' (Claude Code) ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ২০২৬ সালের ১০ জুলাই থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে সফটওয়্যারটির মধ্যে লুকানো 'ব্যাকডোর' ও চীনা ব্যবহারকারীদের ট্র্যাক করার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ, যা সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে প্রকাশ পেয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি নিরাপত্তা সতর্কতা নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতা ও কোম্পানিদ্বয়ের মধ্যে তিক্ত দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
## ক্লড কোডের 'গুপ্তচর' সক্ষমতা উন্মোচন
গত জুনের শেষদিকে নিরাপত্তা গবেষকরা 'রেডিট' (Reddit) এবং 'গিটহাব'-এ (GitHub) ক্লড কোডের একটি গুরুতর ত্রুটি বা সুপ্ত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেন। 'LegitMichel777' নামে পরিচিত এক গবেষক দাবি করেন, তিনি সফটওয়্যারটির কোড উল্টোভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল প্রকাশিত সংস্করণ ২.১.৯১ থেকে এতে এমন কিছু কোড যুক্ত রয়েছে যা ব্যবহারকারীর কম্পিউটারের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এই কোডটি ব্যবহারকারীর সিস্টেমের সময় অঞ্চল (টাইমজোন) পরীক্ষা করে দেখত, বিশেষ করে 'এশিয়া/শাংহাই' বা 'এশিয়া/উরুমকি' চিহ্নিত করত এবং প্রক্সি সার্ভারের ঠিকানা চীনা ডোমেইনের তালিকার সাথে মিলিয়ে দেখত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই তথ্য সংগ্রহ সাধারণ পদ্ধতিতে করা হতো না। বরং 'স্টেগানোগ্রাফি' (steganography) নামক একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে ডেটা লুকানো হতো। অর্থাৎ, ব্যবহারকারীর টাইমজোন চীনা হলে সিস্টেম প্রম্পটের তারিখের ফরম্যাট ড্যাশ থেকে স্ল্যাশে পরিবর্তন করা হতো এবং অ্যাপোস্ট্রফি চিহ্নকে ভিন্ন ইউনিকোড ক্যারেক্টার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হতো। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো সাধারণ ব্যবহারকারী বা এআই মডেলের চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু অ্যানথ্রোপিকের সার্ভারগুলো সহজেই তা শনাক্ত করতে পারে। কোডটির কিছু অংশ 'XOR' পদ্ধতিতে এনক্রিপ্ট করা ছিল, যা সাধারণ বিশ্লেষণে তথ্য বের করা কঠিন করে তুলেছিল।
গবেষকরা বলছেন, এই প্রক্রিয়াটি মূলত চীনা ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এটি কোনো সরাসরি 'টেলিমেট্রি' ডেটা প্রেরণ করত না, বরং সিস্টেম প্রম্পটের মধ্যে ক্ষুদ্র পরিবর্তন এনে একটি সুপ্ত সংকেত পাঠাত।
## অ্যানথ্রোপিকের ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়া
এই বিতর্কের মুখে অ্যানথ্রোপিকের ক্লড কোড প্রকৌশলী থারিক শিহিপার (Thariq Shihipar) এক্স (X) প্ল্যাটফর্মে জানান, এটি ছিল 'মার্চ মাসে চালু করা একটি পরীক্ষা'। তাদের উদ্দেশ্য ছিল অননুমোদিত পুনঃবিক্রেতাদের অ্যাকাউন্ট অপব্যবহার রোধ করা এবং এআই মডেল 'ডিস্টিলেশন' (distillation) প্রতিরোধ করা। তিনি আরও বলেন, এই বৈশিষ্ট্যটি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ১ জুলাইয়ের মধ্যে তা কার্যকর করা হবে।
এই ঘোষণার পরেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, কোনো সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর অজান্তে তার সিস্টেম থেকে এভাবে তথ্য সংগ্রহ করলে তা কি গোপনীয়তা লঙ্ঘন নয়? বিশেষ করে যখন এই তথ্য সংগ্রহ 'স্টেগানোগ্রাফিক' পদ্ধতিতে লুকানো হয়, তখন তা স্বচ্ছতার অভাব এবং ক্রস-বর্ডার ডেটা কমপ্লায়েন্সের প্রশ্নও তুলে দেয়।
## ডিস্টিলেশন আক্রমণের অভিযোগ: দ্বন্দ্বের সূত্রপাত
এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, এর আগে জুন মাসে অ্যানথ্রোপিক আলিবাবার বিরুদ্ধে 'ডিস্টিলেশন আক্রমণ' চালানোর গুরুতর অভিযোগ আনে। ২০২৬ সালের ১০ জুন মার্কিন সিনেটর টিম স্কট এবং এলিজাবেথ ওয়ারেনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অ্যানথ্রোপিক দাবি করে, আলিবাবার 'কুইউয়েন' (Qwen) এআই ল্যাবের সাথে যুক্ত কিছু অপারেটর প্রায় ২৫,০০০ জাল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ২২ এপ্রিল থেকে ৫ জুনের মধ্যে ২.৮৮ কোটিরও বেশি বার ক্লড মডেলের সাথে যোগাযোগ করেছে।
অ্যানথ্রোপিকের মতে, এই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল তাদের অত্যাধুনিক 'মিথোস প্রিভিউ' (Mythos Preview) মডেলের সক্ষমতা অনুকরণ করা। 'ডিস্টিলেশন' হলো একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি উন্নত এআই মডেলের আউটপুট ব্যবহার করে একটি কম শক্তিশালী মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অ্যানথ্রোপিক অভিযোগ করে, এই পদ্ধতিতে চীনা প্রতিযোগীরা বিপুল গবেষণা ও উন্নয়ন খরচ না করেই অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তির নকল তৈরি করতে পারে, যা মার্কিন প্রযুক্তির বিরুদ্ধে 'শিল্প-পরিমাণের চুরি'।
অ্যানথ্রোপিক আরও উল্লেখ করে যে, এটি প্রথমবার নয়; এর আগেও তারা 'ডিপসিক', 'মুনশট এআই' এবং 'জিপু এআই'-এর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ এনেছিল। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে অ্যানথ্রোপিক চীনা ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে শুরু করে এবং তাদের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে।
## আলিবাবার নিষেধাজ্ঞা ও নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর
আলিবাবা অবশ্য অ্যানথ্রোপিকের এই অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে ক্লড কোডে 'ব্যাকডোর' ঝুঁকি পাওয়ার পর তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। 'সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলিবাবা অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লড কোডকে 'উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সফটওয়্যার' হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ১০ জুলাই থেকে অফিস পরিবেশে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কর্মীদের জন্য বিকল্প হিসেবে আলিবাবার নিজস্ব এআই কোডিং প্ল্যাটফর্ম 'কোডার' (Qoder) ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত আলিবাবার জন্য বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন। কারণ চলতি বছরের শুরুতে তারা কর্মীদের ক্লড, জিপিটি-সহ বিভিন্ন বাহ্যিক মডেল ব্যবহারে উৎসাহিত করত এবং তার জন্য ভর্তুকি দিত। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়াতে তারা এখন নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বাধ্য করছে।
আলিবাবার এই পদক্ষেপের আরেকটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০২৬ সালের ৮ জুন পেন্টাগন আলিবাবাকে 'চীনা সামরিক কোম্পানির তালিকা'-তে অন্তর্ভুক্ত করে। যদিও এই তালিকা সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নয়, তবুও এটি মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে। আলিবাবা এই তালিকা থেকে নিজেদের নাম তুলতে ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে মামলা করেছে।
## ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়। যুক্তরাষ্ট্র যখন অত্যাধুনিক চিপ ও এআই প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলো নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা মার্কিন এআই টুলের ওপর চীনা কোম্পানিগুলোর আস্থা কমিয়ে দেবে এবং তাদেরকে 'ডিপসিক', 'কুইউয়েন'-এর মতো দেশীয় ও ওপেন-সোর্স মডেলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করবে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর নীতি তাদের চীনের বিশাল বাজার থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্যও ক্ষতির কারণ হবে।
'এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট'-এর ফেলো লিজি লি (Lizzi Lee) বলেন, "এই দ্বন্দ্ব দেখায় যে মার্কিন-চীন এআই প্রতিযোগিতা প্রযুক্তির বাইরে গিয়ে প্রবেশাধিকার ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে পৌঁছেছে"।
আলিবাবার ক্লড কোড নিষেধাজ্ঞা একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের সংকট এবং এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতার তীব্রতাকেই তুলে ধরে। ভবিষ্যতে এই ধরনের নিরাপত্তা ও মেধাস্বত্ব বিতর্ক আরও বাড়তে পারে, যা বিশ্ব এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ পথকে পুনর্নির্ধারণ করবে।

