আজকের আধুনিক ও গতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো গভীরভাবে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। যতই প্রযুক্তির উন্নয়ন হোক না কেন, শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল, খনিজ জ্বালানি, নিত্যদিনের ভোক্তা পণ্য কিংবা খাদ্যশস্য—সব ক্ষেত্রেই সামুদ্রিক পরিবহনই পৃথিবীর সবচেয়ে সাশ্রয়ী, বৃহৎ ও কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে টিকে রয়েছে। সমুদ্রপথের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিপুল এবং প্রায় অসীম পরিবহনক্ষমতা। একটি বিশালাকার আধুনিক কনটেইনার জাহাজ বা তেলবাহী সুপার ট্যাংকার একবারে যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন করতে পারে, সেই সমপরিমাণ পণ্য স্থলপথে বহনের জন্য হাজার হাজার ট্রেন বা লাখো ট্রাকের প্রয়োজন হয়, যা কার্যত অসম্ভব এবং চরম ব্যয়বহুল। শুধু তা-ই নয়, সমুদ্রপথে দীর্ঘ দূরত্বের পরিবহন ব্যয়ও স্থলপথের তুলনায় বহুগুণ কম। বিশ্বের প্রধান প্রধান সমুদ্রবন্দর, স্বয়ংক্রিয় কনটেইনার–ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অভিন্ন নিয়ম, বিমা ও আর্থিক কাঠামো—সব মিলিয়ে গত কয়েক দশক ধরে একটি অত্যন্ত পরিণত ও নিপুণ বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। স্থলপথে শত চেষ্টা করলেও আজ পর্যন্ত সেই মাত্রার বৈশ্বিক সমন্বয় বা অবকাঠামোগত দক্ষতা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
স্থলপথের ক্ষেত্রে আরেকটি সবচেয়ে বড় এবং জটিল সীমাবদ্ধতা হলো ভূরাজনীতি। একটি আন্তর্জাতিক স্থল করিডরকে সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হলে এর রুটে থাকা একাধিক দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও নিবিড় রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ভিন্ন ভিন্ন দেশের শুল্কনীতি, রেলপথের ট্র্যাকের মান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক বিধি—সবকিছু যদি একই সাথে মসৃণভাবে কার্যকর না হয়, তবে সেই করিডরের সামগ্রিক দক্ষতা ও গতি মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে বিপুল অর্থ খরচ করে কেবল চোখধাঁধানো ভৌত অবকাঠামো তৈরি করলেই একটি স্থলপথ বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়ে ওঠে না। তবে বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যের ক্ষেত্রে আশার কথা হলো, হরমুজ, সুয়েজ কিংবা মালাক্কার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো সামুদ্রিক প্রণালিতে সাময়িক কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক বিঘ্ন ঘটলেও, তার জন্য পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা একবারে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের বিশালতা বিকল্প রুট খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেয়, যা স্থলপথের অবরুদ্ধ সীমানায় সহজে মেলে না।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আধুনিক ভূরাজনীতির এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন। বহু বছর আগে ‘মালাক্কা দ্বিধা’ থেকে চীনের যে কৌশলগত উদ্বেগের শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বেইজিংয়ের সেই চিন্তা এখন আরও পরিণত ও দূরদর্শী রূপ নিয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের শুরুর দিকে চীনের মূল লক্ষ্য ছিল মালাক্কার বিকল্প একটিমাত্র নিরাপদ পথ খুঁজে বের করা। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বেইজিং খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে, একটিমাত্র বিকল্প করিডর কখনোই বিশাল সমুদ্রপথের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারে না। কারণ, ভৌগোলিক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার জন্য কোনো একক স্থলপথের পক্ষে সমুদ্রপথের সমপরিমাণ বিপুল পণ্য পরিবহন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে যেভাবে নতুন নতুন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক যুদ্ধবিগ্রহ বেড়েছে, তা চীনের মতো বড় অর্থনীতিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্য কৌশল নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে বেইজিং এখন এমন একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক সংযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট পথ, বন্দর বা সংকীর্ণ সামুদ্রিক প্রণালির ওপর তাদের অতিরিক্ত নির্ভর করতে না হয়।
চীনের এই আধুনিক ও দূরদর্শী চিন্তার পেছনে কাজ করছে একটি অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অর্থনীতিতে এই কৌশলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘করিডর-হেজিং’। সহজ ভাষায় বিষয়টি বুঝতে গেলে শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের দিকে তাকানো যায়। একজন বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারী যেমন তার সব অর্থ বা পুঁজি কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিতে বা একটিমাত্র খাতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিনিয়োগ করেন না, ঠিক তেমনি চীনও এখন তার সামগ্রিক বাণিজ্যিক ও জ্বালানি সরবরাহের রুটকে একটিমাত্র পথ বা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল রাখতে চাইছে না। এই কৌশলে সমুদ্রপথই চীনের বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বহাল থাকবে, কিন্তু প্রয়োজনের সময় বা জরুরি সংকটে ব্যবহারের জন্য বেইজিং একাধিক কার্যকর বিকল্প স্থল ও সমুদ্র পথও সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখতে চায়। বেইজিংয়ের এই মহাপরিকল্পনা আসলে সমুদ্রভিত্তিক বিশ্বায়নকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নয়, বরং এটি হলো সমুদ্রপথেরই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী পরিপূরক ব্যবস্থা। চীন খুব ভালো করেই জানে যে, আগামী কয়েক দশকেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি সমুদ্রপথই থাকবে। কিন্তু সেই প্রধান ভিত্তির পাশাপাশি যদি কিছু কার্যকর ও সচল স্থলপথ, গ্যাস ও তেলের পাইপলাইন, আন্তঃদেশীয় রেলপথ কিংবা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর প্রস্তুত রাখা যায়, তবে বড় ধরনের কোনো বৈশ্বিক সংকটের সময়ও দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
চীনের এই সামগ্রিক কৌশলগত ও সামরিক আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালির চেয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব এবং উদ্বেগ অনেক বেশি। গত দুই দশকে বেইজিং তাদের তেল ও গ্যাস আমদানির উৎস উল্লেখযোগ্যভাবে বৈচিত্র্যময় করতে সক্ষম হয়েছে। তারা এখন আর কেবল নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া, অ্যাঙ্গোলা এবং ব্রাজিলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করছে। এর ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারী দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ওপর চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা আর জিম্মি নেই। কিন্তু তেলের উৎস বৈচিত্র্যময় হলেও, সেই তেল পরিবহনের যে মূল রুট বা পথ, সেটির ক্ষেত্রে গত দুই দশকে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া তেলবাহী জাহাজগুলো প্রথমে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বিশাল ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। এরপর সেই আমদানিকৃত তেলের সিংহভাগ অংশই মালাক্কা প্রণালি হয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল দক্ষিণ চীন সাগর পেরিয়ে তবেই চীনের মূল ভূখণ্ডের বন্দরে পৌঁছায়। আবার অন্যদিকে আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকা থেকে আমদানি করা অধিকাংশ খনিজ জ্বালানি ও কাঁচামালও শেষ পর্যন্ত এই মালাক্কা প্রণালি পেরিয়েই পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছাতে হয়। অর্থাৎ তেলের উৎস বা বিক্রেতা দেশ ভিন্ন ভিন্ন হলেও, পরিবহনের ক্ষেত্রে চীনের আমদানি বাণিজ্যের একটি বিরাট অংশ এখনো এই একটিমাত্র সংকীর্ণ জলপথের ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল। আর ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে আছে চীনের মূল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ।
উৎস ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পরিবহনের বড় অংশ কয়েকটি নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক পথেই কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। এই অতি-নির্ভরতাকেই চীনের নীতিনির্ধারকেরা ও সামরিক বিশ্লেষকেরা ‘মালাক্কা দ্বিধা’ বা ‘মালাক্কা দোটানা’ নামে অভিহিত করে আসছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। ২০০৩ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও প্রথম প্রকাশ্যে বেইজিংয়ের এই গভীর কৌশলগত উদ্বেগের কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন। এরপর থেকেই এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে একটি বহুল আলোচিত শব্দে পরিণত হয়। এই ধারণার মূল ভিত্তিটি ছিল অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট। যদি কোনো রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মালাক্কা প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবেও ব্যাহত হয়, তবে চীনের বিশাল অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ শিল্প উৎপাদন ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা একযোগে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়বে। কারণ বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও প্রধান এই নৌপথ ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং কৌশলগতভাবে চরম সংবেদনশীল একটি অঞ্চলে অবস্থিত।
ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে দেখা যায়, মালাক্কা প্রণালি মালয় উপদ্বীপ তথা পশ্চিম মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এটি পশ্চিমে আন্দামান সাগর হয়ে বিশাল ভারত মহাসাগরের সাথে এবং পূর্বে দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে উন্মুক্ত প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। এই নৌপথটি প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার বা ৫৩০ মাইল দীর্ঘ। তবে এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর ফানেলের মতো আকৃতি, যার দক্ষিণ অংশটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংকীর্ণ। বিশেষ করে ফিলিপস চ্যানেলের কাছে এই পথটি মাত্র ২.৮ কিলোমিটার চওড়া, যা একটি বিশাল তেলের ট্যাংকারের নেভিগেশনের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। চীনের এই উদ্বেগের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দিক হলো বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। মালাক্কা প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত জলপথ হলেও, যেকোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সংকটের সময়ে এর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচলের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্রদেশগুলোর যে বিশাল প্রভাব রয়েছে, তা বেইজিং সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্ব ও আশঙ্কার সাথে বিবেচনা করে।
দক্ষিণ চীন সাগর, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি ও আধিপত্য এবং এই অঞ্চলের মিত্রদেশগুলোর সাথে ওয়াশিংটনের কোয়াড বা অন্যান্য নিরাপত্তা সহযোগিতা বেইজিংয়ের এই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যে, কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত দেখা দিলে শত্রুপক্ষ মালাক্কা প্রণালি অবরোধ করে চীনের জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ লাইনের শ্বাসরোধ করে দিতে পারে। যদিও আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় এমন একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ সম্পূর্ণ অবরোধ করা বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ ও বিতর্ক রয়েছে, তবুও এই দূরবর্তী সম্ভাবনাই চীনকে তার বিকল্প অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের অন্যতম প্রধান কৌশলগত প্রেরণা জুগিয়েছে। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে চীনের ঝুঁকি মূল্যায়নের ধরন ও কৌশলগত দর্শনেও বড় ধরনের বিবর্তন এসেছে। এখন বেইজিং পুরো বৈশ্বিক পরিবহনব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন কোনো পথ হিসেবে না দেখে, একটি বিশাল ও আন্তঃসংযুক্ত নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখছে। ফলে তাদের নীতিনির্ধারণী প্রশ্নটি এখন আর শুধু তেল বা কাঁচামাল কোন দেশ থেকে আসছে, এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তাদের কাছে এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেই আমদানিকৃত তেল বা পণ্য বৈশ্বিক পরিবহনব্যবস্থার জটিল জালের ভেতর দিয়ে কীভাবে চলাচল করছে এবং এর রুটগুলোর কোথায় কোথায় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ঠিক এই কারণেই চীনের মূল অর্থনৈতিক লক্ষ্য এখন আর সমুদ্রপথকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন বা বর্জন করা নয়, যা কার্যত অসম্ভব। বরং তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো এমন কিছু অতিরিক্ত ও সমান্তরাল করিডর তৈরি করে রাখা, যেগুলো যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে মূল সমুদ্রপথের ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপ বা ঝুঁকি সাময়িকভাবে কমাতে পারে। আর বেইজিংয়ের এই বাস্তবমুখী ও আধুনিক চিন্তাভাবনা থেকেই বিশ্বমঞ্চে শুরু হয় চীনের নতুন ভূরাজনৈতিক চাল, যার নাম ‘করিডর-হেজিং’। শুরুতে লক্ষ্য ছিল একটি একক বিকল্প রুট তৈরি করা; কিন্তু সময়ের সাথে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে বেইজিং এখন সমুদ্রপথের পাশাপাশি একাধিক স্থলপথ, আন্তর্জাতিক পাইপলাইন, আন্তঃদেশীয় উচ্চগতির রেলপথ ও আঞ্চলিক করিডর গড়ে তুলে তাদের অর্থনৈতিক ঝুঁকি চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে চাইছে, যেন একটি পথ বন্ধ হলেও বাকি পথগুলো সচল থাকে।
এই দূরদর্শী কৌশলের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও বহুল আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো ‘চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর’ বা সিএমইসি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে সড়ক, রেলপথ এবং আধুনিক তেল-গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশকে সরাসরি যুক্ত করার এই মহাপরিকল্পনা মোটেও সাধারণ কোনো দ্বিপাক্ষিক অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি আসলে মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের চিরন্তন নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনার একটি অত্যন্ত সুনিপুণ ও বাস্তবমুখী কৌশলগত চেষ্টা। এই করিডর সচল থাকলে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকা থেকে আসা চীনের বিশাল সব জ্বালানিবাহী জাহাজকে আর পুরো মালাক্কা প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগর অতিক্রম করতে হবে না। জাহাজগুলো সরাসরি বঙ্গোপসাগর হয়ে মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দরে পৌঁছাতে পারবে এবং সেখান থেকে পাইপলাইন ও স্থলপথের মাধ্যমে সেই জ্বালানি ও পণ্য সরাসরি চীনের মূল ভূখণ্ডের ইউনান প্রদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। যদিও এই পার্বত্য করিডরের পরিবহন সক্ষমতা সমুদ্রপথের তুলনায় সীমিত, তবুও যেকোনো বৈশ্বিক বা সামরিক সংকটের সময়ে এটি চীনের জন্য একটি লাইফলাইন বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হয়ে উঠতে পারে।
একই ধরনের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত যুক্তি কাজ করছে ‘চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর’ বা সিপিইসি-র ক্ষেত্রেও। পাকিস্তানের গওয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিশাল করিডরটি সরাসরি আরব সাগরের সাথে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশের একটি সরাসরি সংযোগ তৈরি করেছে। ভৌগোলিক দুর্ঘমতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই রুটটি হয়তো কখনোই মূল সমুদ্রপথের বিকল্প হয়ে উঠবে না, কিন্তু চীনের কৌশলগত দৃষ্টিতে এর মূল্য ও গুরুত্ব অন্য জায়গায়—তা হলো সংকটের সময়ে একটি সুরক্ষিত বিকল্প প্রবেশপথ। এ ছাড়া মধ্য এশিয়া থেকে সরাসরি চীনে আসা প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্কও বেইজিংয়ের এই একই হেজিং কৌশলের একটি সফল অংশ। তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান থেকে আন্তর্জাতিক পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরাসরি পশ্চিম চীনে পৌঁছায়, যার জন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক প্রণালি বা আন্তর্জাতিক জলপথ অতিক্রম করতে হয় না। ফলে সমুদ্রপথে কোনো বড় ধরনের যুদ্ধ বা অবরোধ তৈরি হলেও, চীন অন্তত তাদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির একটি বড় অংশ এই স্থলভিত্তিক নিরাপদ উৎস থেকে নিশ্চিত করতে পারবে।
একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর’ বা সিএমবিইসি গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই নতুন করিডর প্রস্তাবও যে বঙ্গোপসাগরে নিজের অবস্থান সুসংহত করার লক্ষ্যে চীনের সেই বৃহত্তর ‘করিডর-হেজিং’ কৌশলেরই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত এক দশকে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই, কিংবা এর বিপরীতে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর’, ট্রান্স-কাস্পিয়ান রুট কিংবা চীন–মিয়ানমার ও চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ হয়েছে। এসব বিশাল সব প্রজেক্ট দেখে অনেকের মনেই হয়তো এমন একটি সরল ও ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আধুনিক স্থলপথগুলো হয়তো ধীরে ধীরে সমুদ্রপথের ঐতিহ্যবাহী জায়গা পুরোপুরি দখল করে নেবে। কিন্তু বাস্তব অর্থনৈতিক সমীকরণ ও ভৌগোলিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর এই কঠিন বাস্তবতার আলোকেই চীনের মূল কৌশলটি এখন বিশ্ববাসীর কাছে আরও বেশি পরিষ্কার ও উন্মোচিত হয়ে উঠছে।
বেইজিং খুব ভালো করেই জানে যে, আগামী বহু দশকেও সমুদ্রপথের কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প তৈরি করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। একই সাথে এটিও বাস্তব সত্য যে মালাক্কা, হরমুজ কিংবা সুয়েজের মতো বিশ্বের অতি-গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রণালিগুলোকে ঘিরে যে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও সামরিক উত্তেজনা রয়েছে, তাও পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। একসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বলা হতো, যে পরাশক্তি বিশ্বের সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করবে, পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ও ক্ষমতা তার করতলগত থাকবে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে ভূরাজনীতির সেই পুরনো সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে কৌশলগত সুবিধা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখন আর কেবল সমুদ্রের একক নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করছে না, বরং তা ক্রমেই নির্ভর করছে কার হাতে সংকটের সময়ে সবচেয়ে বেশি কার্যকর বিকল্প পথ বা করিডর রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অবরোধের মধ্যেও কে তার দেশের পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখতে পারে, তার ওপর।
তাই চীনের বর্তমান লক্ষ্য কোনো একটি একক ‘সুপার করিডর’ তৈরি করে বিশ্বকে চমকে দেওয়া নয়, বরং এমন একটি জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত সংযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একাধিক স্থল ও সমুদ্র পথ একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। যদি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই সেই পথের ব্যবহার কমবে এবং তৎক্ষণাৎ অন্য বিকল্প পথটির গুরুত্ব ও ব্যবহার বাড়িয়ে দেওয়া হবে। আবার কোথাও যদি কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়, তবে সেই পথ এড়িয়ে বিকল্প করিডর কাজে লাগানো যাবে। আর যখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সমুদ্রপথ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে, তখন এই স্থল করিডরগুলো সীমিত পরিসরেই ব্যবহৃত হবে। এই যে নমনীয়তা এবং দ্রুত পথ পরিবর্তনের ক্ষমতা, এটিই হলো আধুনিক ‘করিডর-হেজিং’ কৌশলের মূল শক্তি ও সৌন্দর্য। অর্থাৎ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শুধু নতুন নতুন পথ নির্মাণের নয়, বরং এমন একটি সহনশীল সংযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার, যা যেকোনো চরম সংকটের মধ্যেও দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারে। আর ঠিক এই জায়গাতেই ইরান, মিয়ানমার, পাকিস্তান, মধ্য এশিয়া কিংবা কাস্পিয়ান অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব অঞ্চল হয়তো সরাসরি কখনো বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠবে না, কিন্তু যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে বিকল্প লাইফলাইন হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তাদের ভূরাজনৈতিক মূল্য বহুগুণ বেড়ে যাবে। ভবিষ্যতের বিশ্ববাণিজ্যের রাজনীতি সম্ভবত কোনো একক করিডরের আধিপত্য দিয়ে নির্ধারিত হবে না, বরং এটি হবে একাধিক পরস্পর-সম্পূরক সংযোগপথের রাজনীতি, যেখানে একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য পথ পুরো বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখার দায়িত্ব নেবে। আর ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিতে এই বহুমাত্রিক সক্ষমতাই রাষ্ট্রগুলোর টিকে থাকার ও জয়ী হওয়ার নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠবে।