বিশ্ববাজারে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে অপরিশোধিত তেলের দাম নিম্নমুখী হয়েছে। ওপেক ও সহযোগী দেশগুলোর (ওপেক+) উৎপাদন বৃদ্ধির নতুন সিদ্ধান্ত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এর ফলেই সোমবার ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে।
সোমবার সকালে লেনদেন চলাকালে আন্তর্জাতিক মানের ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪২ সেন্ট বা ০.৫৮ শতাংশ কমে ৭১.৭০ মার্কিন ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডের দাম ২৭ সেন্ট বা ০.৩৯ শতাংশ কমে ৬৮.৪২ মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাজার বন্ধ থাকায় শুক্রবার ডব্লিউটিআইয়ের আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তিমূল্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে মূল্যহ্রাসের প্রধান কারণ হলো ওপেক জোটের উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত। রোববার অনুষ্ঠিত বৈঠকে ওপেক, রাশিয়া এবং সহযোগী দেশগুলো আগস্ট মাস থেকে দৈনিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আরও ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর আগে জুন ও জুলাই মাসেও একই পরিমাণ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছিল।
তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গত কয়েক মাসে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত। যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি এবং সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহও বাড়তে শুরু করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়। এই রুটে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনরায় শুরু হওয়ায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইজি (IG)–এর বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, ওপেক+–এর উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় অনেক সদস্য দেশ এখনো নির্ধারিত উৎপাদন কোটায় পৌঁছাতে পারেনি। তাই ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাস্তব উৎপাদন পরিস্থিতিই বাজারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর জোটের উৎপাদন কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় সচল করছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পরিমাণ বাড়াচ্ছে।
রয়টার্স পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, জুন মাসে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত তেল উৎপাদন আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক ১ কোটি ৯৪৩ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক দুই দশকের মধ্যে অন্যতম বড় পুনরুদ্ধার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, জুন মাসে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি মে মাসের তুলনায় দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মোট রপ্তানি ১ কোটি ব্যারেলের সীমা অতিক্রম করেছে। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থার তুলনায় এই রপ্তানি এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ কম রয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সমুদ্রবন্দরগুলো থেকেও অপরিশোধিত তেল রপ্তানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় দেশটির কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়া অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। জুলাই মাসেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, ওপেক+–এর ভবিষ্যৎ নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি চাহিদা আগামী কয়েক মাসে তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি বাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় আন্তর্জাতিক তেলের দামের এই পরিবর্তন বিভিন্ন দেশের পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি এবং আমদানি ব্যয়ের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ওপেক+–এর পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির দিকে এখন বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি বাজার সংশ্লিষ্টদের বিশেষ নজর রয়েছে।



