প্রায় এক বছর আগে বাগ্দানের ঘোষণার পর থেকেই মার্কিন পপ তারকা টেইলর সুইফট ও এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসির বিয়ে নিয়ে বিশ্বজুড়ে আগ্রহের পারদ চড়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই নিউইয়র্কে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন এই আলোচিত জুটি। তবে এখন পর্যন্ত তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, আর সম্ভাব্য ভেন্যু ও অনুষ্ঠানসূচি ঘিরে যে খবর প্রচার হচ্ছে, তাতে যেন এক রহস্যের আবরণ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে বিয়ের আয়োজন হতে পারে। ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত অ্যারেনা’ হিসেবে পরিচিত এই ভেন্যুতে প্রায় ২০ হাজার দর্শক বসতে পারেন। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের সঙ্গে টেইলর সুইফটের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৯ সালে ‘ফিয়ারলেস’ সফরের সময় প্রথম সেখানে পারফর্ম করেন তিনি; পরে ‘স্পিক নাউ’ বিশ্ব সফরেও একই ভেন্যুতে কনসার্ট করেন। এমনকি ২০১৯ সালে নিজের ৩০তম জন্মদিনও উদ্যাপন করেছিলেন এখানকার একটি অনুষ্ঠানে। তবে বিয়ের ভেন্যু হিসেবে এই মাঠের নাম নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, ততটাই রয়েছে সংশয়। ভেন্যুটির প্রকাশিত অনুষ্ঠানসূচিতে গত জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত টেইলর-কেলসির কোনো অনুষ্ঠানের উল্লেখ নেই এবং তাঁদের পক্ষ থেকেও কোনো নিশ্চিত বক্তব্য আসেনি।
বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, টেইলর সুইফট ও ট্রাভিস কেলসির সম্ভাব্য বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে একটি সীমিত পরিসরের নৈশভোজ দিয়ে শুরু হতে পারে। এই আয়োজনে প্রায় ১০০ জন ঘনিষ্ঠ অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে খবর। মূল বিয়ের অনুষ্ঠান আগামীকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত হতে পারে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে; সম্ভাব্য অতিথির সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি বলে দাবি করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমগুলো আরও বলছে, টেইলরের ঘনিষ্ঠ শিল্পী স্টিভ নিকস ও টিম ম্যাকগ্রো বিয়ের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করতে পারেন, পাশাপাশি এড শিরান ও পল ম্যাকার্টনির নামও সম্ভাব্য পারফর্মার হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে এসব তথ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ নেই।
মার্কিন বিনোদনবিষয়ক ওয়েবসাইট টিএমজেডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ভেতরে বিশেষ সাজসজ্জার অংশ হিসেবে একটি দুর্গের আদলে বিশাল কাঠামো নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে তাদের সূত্র জানিয়েছে। গত বুধবার ভেন্যুর বাইরে সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও কৌতূহলী মানুষের ভিড় দেখা যায় এবং ট্রাক ও বিভিন্ন সরঞ্জাম বহনকারী যানবাহনের আনাগোনা নতুন করে জল্পনা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনা থেকে আসা এক নারী দর্শনার্থী জানান, তিনি নিশ্চিত নন এটি সত্যিই টেইলর সুইফটের বিয়ের প্রস্তুতি কি না, কিন্তু ঘটনাটি তাঁকে ভীষণ কৌতূহলী করে তুলেছে। অন্যদিকে নিউইয়র্কের গণপরিবহন সংস্থার প্রধান জানো লেইবার বলেছেন, সম্ভাব্য বিয়ের বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই; তবে যদি বড় কোনো অনুষ্ঠান হয়ে থাকে, তাহলে অতিথিদের ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে শহরের যানজট কম থাকে।
এর আগে গুঞ্জন উঠেছিল, টেইলর সুইফটের রোড আইল্যান্ডের ওয়াচ হিলে অবস্থিত সমুদ্রতীরবর্তী বাড়িতেই ছোট পরিসরে বিয়ে হতে পারে। এলাকার পরিচিত ওয়েডিং প্ল্যানার নিকোল সিমেরালকে ওই এলাকায় একাধিকবার দেখা যাওয়ায় জল্পনা আরও বাড়ে। তবে তিনি পরে জানান, জুন মাসজুড়ে ওই এলাকায় তাঁর একাধিক বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল এবং টেইলর সুইফটের বিয়ের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর মতে, এত বড় আয়োজনের জন্য ওয়াচ হিল খুব একটা বাস্তবসম্মত স্থানও নয়।
প্রতিবেদনগুলোয় দাবি করা হয়েছে, অনুষ্ঠানে প্রায় এক শ অতিথি উপস্থিত থাকতে পারেন। কেলসির পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের পাশাপাশি কানসাস সিটি চিফস দলের কয়েকজন খেলোয়াড়কে দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে টেইলর সুইফটের অতিথি তালিকায় থাকতে পারেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সেলেনা গোমেজ, ব্লেক লাইভলি, রায়ান রেনল্ডসসহ হলিউডের বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ। কয়েক মাস আগে ব্রিটেনের যুবরাজ প্রিন্স উইলিয়াম রসিকতা করে বলেছিলেন, তিনি বিয়ের আমন্ত্রণ পাওয়ার আশায় আছেন; তবে পরে মার্কিন সাময়িকী পিপল জানায়, আমন্ত্রণ পেলেও প্রিন্স উইলিয়াম ও তাঁর স্ত্রী ক্যাথরিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারবেন না।
মার্কিন ট্যাবলয়েডগুলোর দাবি, সম্ভাব্য অতিথিদের গোপনীয়তা চুক্তিতে সই করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রচলিত কাগুজে আমন্ত্রণপত্রের বদলে ব্যক্তিগত ফোনকলের মাধ্যমে অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যাতে বিয়ের স্থান ও সময় আগেভাগে ফাঁস না হয়। খবরে আরও বলা হয়েছে, অতিথিদের শুধু ২ ও ৩ জুলাই তারিখ দুটি ফাঁকা রাখতে বলা হয়েছে; অনুষ্ঠান কোথায় হবে কিংবা পুরো সূচি কী, তা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানানো হয়নি। আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই গোপনীয়তা বজায় রাখতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো অঘটন বা তথ্য ফাঁস না হয়।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে টেইলর সুইফট তখন তাঁর বহুল আলোচিত ‘ইরাস ট্যুর’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যস্ত। সেই সময় কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে কনসার্ট দেখতে যান ট্রাভিস কেলসি এবং কনসার্ট শেষে টেইলরের হাতে নিজের ফোন নম্বর লেখা একটি ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রেসলেট’ তুলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কনসার্টের পর কণ্ঠ বিশ্রামে থাকায় টেইলর দর্শকদের সঙ্গে দেখা করেননি। পরে নিজের ‘নিউ হাইটস’ পডকাস্টে ট্রাভিস অকপটে সেই ব্যর্থ চেষ্টার কথা জানান। মজার ছলে বলা সেই গল্পই অপ্রত্যাশিতভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। পরে টেইলর নিজেই স্বীকার করেন, ট্রাভিসের সেই খোলামেলা আচরণ তাঁর নজর কেড়েছিল এবং বিষয়টি তাঁর কাছে অনেকটা পুরোনো দিনের রোমান্টিক সিনেমার দৃশ্যের মতো মনে হয়েছিল।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে একসঙ্গে দেখা যায় দুজনকে। টেইলর সুইফট উপস্থিত হন কানসাস সিটি চিফসের খেলায় এবং বসেছিলেন ট্রাভিসের মা ডোনা কেলসির পাশে। খেলায় ট্রাভিস টাচডাউন করার পর টেইলরের উচ্ছ্বাস ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং ম্যাচ শেষে দুজনকে একসঙ্গে স্টেডিয়াম ছাড়তেও দেখা যায়। সেই মুহূর্ত থেকেই কার্যত প্রকাশ্যে আসে তাঁদের সম্পর্ক। টেইলরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এতটা প্রকাশ্য অবস্থান খুব কমই দেখা গেছে, তাই ভক্তদের কাছেও এটি ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা।
কয়েক মাস পর আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত ইরাস ট্যুরের এক কনসার্টে হাজির হন ট্রাভিস। সেই অনুষ্ঠানে টেইলর তাঁর জনপ্রিয় গান ‘কারমা’-এর একটি লাইন বদলে দিয়ে গেয়ে ওঠেন ‘কারমা ইজ দ্য গাই অন দ্য চিফস’। হাজারো দর্শকের সামনে ট্রাভিসকে উদ্দেশ করে করা এই পরিবর্তন মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কনসার্ট শেষে টেইলর দৌড়ে গিয়ে ট্রাভিসকে আলিঙ্গন করেন, আর সেই ভিডিও আজও ভক্তদের কাছে সম্পর্কটির অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
২০২৪ সালের শুরুতে সম্পর্কটি আরও বেশি আলোচনায় আসে। কানসাস সিটি চিফস সুপার বোলে ওঠার পর টেইলর মাঠে নেমে ট্রাভিসকে অভিনন্দন জানান। পরে টোকিওতে কনসার্ট শেষ করেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে সুপার বোল ফাইনাল দেখতে যান এবং চিফস চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মাঠে দুজনের আলিঙ্গন ও চুম্বনের ছবি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, টেইলরের উপস্থিতির কারণে এনএফএলের নারী দর্শকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
২০২৪ সালে প্রকাশিত টেইলরের অ্যালবাম ‘দ্য টর্চার্ড পোয়েটস ডিপার্টমেন্ট’-এর কয়েকটি গানে ভক্তরা ট্রাভিসের উপস্থিতি খুঁজে পান। বিশেষ করে ‘দ্য আলকেমি’ গানটিকে অনেকেই তাঁদের সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং সুপার বোল জয়ের পর ট্রাভিসের ট্রফি হাতে টেইলরের দিকে ছুটে যাওয়ার দৃশ্যের সঙ্গে গানের কিছু লাইন মিলিয়ে দেখেন ভক্তরা। এই সময় থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের জুটির নতুন নাম হয়ে যায় ‘টেভিস’।
২০২৪ সালের জুনে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইরাস ট্যুরের একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবার ইনস্টাগ্রামে যুগল ছবি প্রকাশ করেন টেইলর। ছবিতে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ যুবরাজ উইলিয়াম এবং তাঁর দুই সন্তান। পরদিন কনসার্টে আরও বড় চমক দেন ট্রাভিস; তিনি অতিথিশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠে টেইলরের পারফরম্যান্সের অংশ হন। এটি ছিল তাঁর প্রথম এবং শেষ মঞ্চ উপস্থিতি, তবে ইউরোপ সফরের বড় অংশেই তিনি টেইলরের সঙ্গে ছিলেন।
টেইলর সুইফটের মতো জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে সম্পর্কে থাকা যে কতটা চাপের, সে বিষয়ে ট্রাভিসের বড় ভাই জেসন কেলসিও কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করা এই জুটির জন্য সহজ নয়; প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। তবু তাঁর মতে, ট্রাভিস নিজের স্বভাব বদলাননি; সাফল্য ও আলোচনার মধ্যেও তিনি আগের মতোই সাধারণ ও বিনয়ী রয়েছেন।
টেইলর সুইফট ও ট্রাভিস কেলসির সম্পর্ক শুরু হওয়ার পর থেকেই তাঁরা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত তারকা জুটির অন্যতম। বাগ্দানের ঘোষণার পর তাঁদের বিয়ে নিয়ে ভক্তদের আগ্রহ আরও বেড়েছে। তবে বিয়ের ভেন্যু, অতিথি তালিকা কিংবা অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ নিয়ে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই এখনো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্রনির্ভর দাবি। টেইলর সুইফট বা ট্রাভিস কেলসি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এসব তথ্যকে গুঞ্জন হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।