ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পাপুয়া প্রদেশে এক নৃশংস হামলায় মার্কিন এক পাইলট নিহত হয়েছেন এবং তার উড়োজাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। পশ্চিম পাপুয়া ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিপিএনপিবি) নামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এ হামলার দায় স্বীকার করেছে এবং একে ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য একটি ‘বার্তা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে আসছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। সম্প্রতি উন্নত অস্ত্রশস্ত্র হাতে পাওয়ায় তাদের হামলা আরও মারাত্মক ও ঘন ঘন হয়ে উঠেছে ।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) হাইল্যান্ড পাপুয়া প্রদেশের ইয়াহুকিমো অঞ্চলে একটি বিমান অবতরণের পর এই ঘটনা ঘটে। টিপিএনপিবির মুখপাত্র সেবি সামবম জানান, তারা মার্কিন পাইলট নিকোলাস এফ গোসেলিনকে গুলি করে হত্যা করেছেন এবং তার বিমানটিতে আগুন ধরিয়ে দেন । তাদের অভিযোগ, উড়োজাহাজটি বারবার ইন্দোনেশীয় সেনাসদস্যদের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিচ্ছিল এবং টিপিএনপিবির জারি করা আলটিমেটাম লঙ্ঘন করছিল । গোষ্ঠীটি সতর্ক করে দিয়েছে, ইন্দোনেশিয়া যদি পাপুয়ার বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত লাল অঞ্চলে বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া বন্ধ না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও হামলা চালানো হবে ।
ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা পাইলটের মরদেহ উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। পাপুয়ার সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল উইরিয়া আরতাদিগুনা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, উদ্ধারকারী দল শুক্রবার সকালে মরদেহ উদ্ধার করে জয়পুরায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে । দশ সদস্যের একটি বিশেষ দল এই উদ্ধার অভিযান চালায় । সামরিক বাহিনী হামলাকারীদের খোঁজের পাশাপাশি ওই ফ্লাইটের যাত্রীদেরও সন্ধান করছে । কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উড়োজাহাজটিতে পাইলটসহ সাতজন যাত্রী ছিলেন, যারা সবাই পাপুয়ার স্থানীয় বাসিন্দা। সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যাত্রীরা সকলেই নিরাপদ আছেন ।
টিপিএনপিবির সরবরাহ করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্দুক ও কুঠারে সজ্জিত বিদ্রোহীরা স্বাধীনতার প্রতীক ‘মর্নিং স্টার’ পতাকা তুলছেন এবং হামলার বিষয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন । উড়োজাহাজটি পিটি এএমএ নামের একটি এয়ারলাইন সংস্থার মালিকানাধীন, যা পাপুয়ার দুর্গম গ্রামগুলোতে খাবার, জ্বালানি ও চিঠি বহন করে থাকে । এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি ।
পাপুয়ায় এই সহিংসতা নতুন নয়। ১৯৬৯ সালে পাপুয়া ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই এ সংঘাত শুরু হয় । বিদ্রোহীদের দাবি, এ সংঘাতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ব্যাপক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়েছে । সম্প্রতি বিদ্রোহীদের হামলা আরও বেড়েছে। গত বছর নিউজিল্যান্ডের এক পাইলটকে অপহরণ করে টিপিএনপিবি, যিনি প্রায় ১৯ মাস পর মুক্তি পান । ২০২৪ সালের আগস্টে আরেক নিউজিল্যান্ডের পাইলটকে গুলি করে হত্যা করা হয় । মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সামরিক অভিযানের কারণে পাপুয়ায় বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে ।
টিপিএনপিবি মুখপাত্র সামবম ইন্দোনেশিয়া সরকারকে সংঘাত নিরসনে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা যদি পাইলটের মরদেহ নিতে চান, তবে তাদের সামরিক বা পুলিশ সদস্য ছাড়া এলাকায় আসতে হবে । জাকার্তায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি । ইন্দোনেশিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানটি অবতরণের আগে কোনো নিরাপত্তা উদ্বেগের তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে অবতরণের পরপরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ।



