কাতারের সানাইয়া এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হয়েছেন। রোববার সকালে সংঘটিত এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর দুপুরের দিকে দেশে তাঁদের স্বজনদের কাছে পৌঁছায়। বিদেশের মাটিতে কর্মরত পাঁচ তরুণের একসঙ্গে প্রাণহানির ঘটনায় কানাইঘাটসহ পুরো সিলেট অঞ্চলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়ভাবে নিহতদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে গভীর বেদনা ও শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে।
কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান শাকিল পাঁচজন বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পাঁচজন নিহত হওয়ার তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছেছে। তবে দুর্ঘটনার পরপরই নিহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছিল। প্রশাসন বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়।
পরবর্তীতে ঝিঙ্গাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল লতিফ নিহত ব্যক্তিদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঝিঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের মাঝতালুক গ্রামের সলিম উল্লাহর ছেলে মোস্তাক আহমদ (৩০), মৃত আহসান উল্লাহর ছেলে জুবায়ের আহমদ (৩০), আগতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন (৩০), আমরপুর গ্রামের আবদুন নূরের ছেলে জিবাল আহমদ (৩৬) এবং দক্ষিণবাণীগ্রাম ইউনিয়নের গাছবাড়ি নয়াগ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদির আহমদ (২৪)। তাঁদের সবাই জীবিকার তাগিদে কাতারে কর্মরত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র এবং নিহতদের স্বজনদের বরাতে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় পাঁচজনই একটি পিকআপ ভ্যানে করে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে যাওয়ার পথে হঠাৎ করেই গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে ঘটনাস্থলেই পাঁচজনের মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় জরুরি সেবাকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য কর্মস্থলে যাতায়াত একটি নিত্যদিনের বিষয় হলেও এই দুর্ঘটনা আবারও বিদেশে শ্রমজীবী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে নির্মাণ ও শিল্পাঞ্চলভিত্তিক এলাকাগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে করে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। এমন পরিস্থিতিতে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
নিহত পাঁচজনের মরদেহ বর্তমানে কাতারের একটি স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন, যাতে তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে শেষ বিদায় জানাতে পারেন।
এই দুর্ঘটনার সংবাদ দেশে পৌঁছানোর পর নিহতদের বাড়িতে শোকের মাতম শুরু হয়। স্বজনদের অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়া পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যরা আর কখনও ফিরে আসবেন না। অনেক পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন নিহত ব্যক্তিরা। ফলে তাঁদের মৃত্যু শুধু মানসিক শোকই নয়, পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের আর্থিক অনিশ্চয়তাও তৈরি করেছে।
কানাইঘাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রতিবেশী এবং সামাজিক সংগঠনের নেতারা নিহতদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন। অনেকে পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাঁদের কঠোর পরিশ্রম ও অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে পাঁচজন কর্মঠ প্রবাসীর একসঙ্গে প্রাণহানি দেশের জন্যও একটি বড় ক্ষতি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কাতারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে।
কাতারে এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু দেশের প্রবাসী সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। জীবিকার সন্ধানে হাজার মাইল দূরে থাকা শ্রমজীবী মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি বেদনাদায়ক স্মারক হয়ে রইল। এখন নিহতদের পরিবারগুলো অপেক্ষা করছে প্রিয়জনদের মরদেহ দেশে ফেরার এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার, যাতে এই কঠিন সময়ে তাঁরা কিছুটা হলেও সাহস ও সমর্থন পেতে পারেন।


