টানা ভারী বর্ষণে আবারও প্রাণহানির সাক্ষী হলো কক্সবাজার। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জেলার উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির এবং কক্সবাজার শহরে ভয়াবহ পাহাড়ধসে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। পাহাড়ধসের পর রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সোমবার ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত পৃথক কয়েকটি ঘটনায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। দুর্যোগের পর প্রশাসন পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসরত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েকদিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, ফলে নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে উখিয়ার ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, রাত প্রায় ১টার দিকে টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে একটি বসতঘরের ওপর পড়ে। ঘটনাস্থলেই মারা যান মোহাম্মদ কামাল হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমাইরা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া মাটি ও কাদার স্তূপ সরিয়ে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করেন।
একই সময় কুতুপালংয়ের ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা কাদার নিচে চাপা পড়ে মারা যায় সাত বছর বয়সী শিশু একরাম। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর কিছুক্ষণ পর, রাত ৩টার দিকে, উখিয়ার ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবারও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। সেখানে মারা যান উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই শিশু রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এই ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন, যাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাহাড় থেকে অব্যাহতভাবে কাদা ও মাটি গড়িয়ে পড়ছিল। তারপরও রাতভর অভিযান চালিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে আলী আকবর (৫০)-এর বসতঘরের ওপর। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তাঁকে ও পরিবারের আরও দুই সদস্যকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়ধসের ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম চলছে।
উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় বসবাসরত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দল ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে কক্সবাজার অঞ্চলে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, সোমবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা ভারী বর্ষণের পর্যায়ে পড়ে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী দুই দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারের পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড় এবং অতিবৃষ্টির সমন্বিত প্রভাবে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে অস্থায়ী ঘরবাড়ি পাহাড়ের ঢালে নির্মিত হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন সবাইকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারে পাহাড়ধস প্রাণহানির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বারবার ফিরে আসবে।

